images

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৫ জুন ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনার পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার অস্থির মিত্রতাকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে নেতানিয়াহুর ওপর এক নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে, যেখানে তার রাজনৈতিক অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে তার অভিযানগুলো যে সফল হয়েছে, তা প্রমাণের ওপরই তার রাজনৈতিক টিকে থাকা নির্ভর করছে। এই পরিস্তিতিতেই  আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় নিজের গদি বাঁচাতে মরিয়া নেতানিয়াহু।

গত সোমবার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে হিজবুল্লাহকে হটাতে বোমা হামলার যে হুমকি নেতানিয়াহু দিয়েছিলেন, তার জেরে ইরান ঘোষণা দেয়— লেবানন সংঘাত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব আলোচনা বন্ধ রাখবে। এতে চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে দাবি করা ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সংকটটি এ নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি ফোনকলের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নেয়, যা বেশ উত্তপ্ত ছিল। ট্রাম্প ক্ষোভ ঝেড়ে নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘তুমি এসব কী করছো?’

এমনকি ওই ফেনকলে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে মনে করিয়ে দেন, তিনি না থাকলে তাকে জেলে থাকতে হতো। 

যদিও ইসরাইলি গণমাধ্যম চ্যানেল ১২ দাবি করেছে, এটি ছিল দুই নেতার মধ্যকার একটি ভুল বোঝাবুঝি। পরে ট্রাম্পও এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আজ ছোট একটি সমস্যা হয়েছিল, তবে আমি খুব দ্রুতই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছি।’

১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নেতানিয়াহু পাঁচজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। যদিও বিল ক্লিনটনসহ প্রত্যেকের সঙ্গেই তার সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। তবে নেতানিয়াহুর জন্য এটি এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ মুহূর্ত। গত সোমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ ভেঙে দেওয়ার বিল প্রথম চেষ্টায় ১০৬-০ ভোটে পাস হওয়ায় আগামী শরতে দেশটিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

ইরানি নেতৃত্বের ওপর সফল হামলার পর জনমত জরিপে তার সমর্থন কিছুটা বাড়লেও গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তার জনপ্রিয়তা এখন পড়তির দিকে। 

সাবেক মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা এবং লবিং গ্রুপ ‘জে স্ট্রিট’-এর প্রধান নীতি কর্মকর্তা ইলান গোল্ডেনবার্গের মতে, ‘এই নির্বাচনে নামার মতো তার (নেতানিয়াহু) কোনো গল্প নেই, তাই তাকে হয় লেবাননে কোনোভাবে জয়লাভ করতে হবে, অথবা জয়লাভ না করলেও অন্তত এই গল্পটা বলতে হবে যে তিনি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।’ 

তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের দেখানোর মতো জোরালো কোনো সাফল্য না থাকায় নেতানিয়াহুকে হয় লেবাননে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে, নয়তো ‘চূড়ান্ত বিজয়ের’ লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার গল্প শোনাতে হবে।

এদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ঘুষের অভিযোগে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার শুনানিও চলতি সপ্তাহে আবার শুরু হয়েছে। র্দীঘদিন ধরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তার পদকে নিয়মিতভাবে এই বিচার বিলম্বিত করার জন্য ব্যবহার করেছেন। এখন যদি ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে বড় বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কা তাকে তাড়া করছে। 

অতীতে তিনি ট্রাম্পকে ইরানে একসঙ্গে হামলা চালানোর জন্য রাজি করাতে পারলেও, ট্রাম্পের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণই বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে তিনি চিন্তিত নন বলে প্রকাশ্যে দাবি করা সত্ত্বেও ট্রাম্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের গড় দাম বৃদ্ধি বিষয়টি চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে, যা করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।  

নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনকলের বিবরণ সময়মতো ফাঁস হওয়া থেকে এটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি কঠোর হিসেবে নিজেদের দেখাতে চায়, যাতে ‘নেতানিয়াহুর ইশারাতেই ট্রাম্প চলছেন’—এমন অপবাদ ঘোচাতে যায়। 

সমীকরণের অপর পক্ষে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ আটকে দিয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। তবে মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও তেলশিল্পের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে। 

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার লেবানন অভিযান হলেও— ইরানের জন্য একটি রেড লাইন হয়ে থাকবে কি না, তা এখনও দেখার বিষয়। যদিও এবিসি নিউজকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি আছেন এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের যা প্রয়োজন, তা তারা আদায় করেই ছাড়বেন’।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এমএইচআর