images

আন্তর্জাতিক

মমতার ১৫ বছরের শাসন তছনছ কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৪ মে ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ পেতে যাচ্ছে বিজেপি। এতে প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে সরকার গঠনের সুবাস পাচ্ছে দলটি। অন্যদিকে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে তৃণমূল শিবিরে।

নির্বাচন কমশিনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতেই এগিয়ে আছে বিজেপি, আর ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল এগিয়ে আছে মাত্র ৮৮টি আসনে। এছাড়া ২টি করে আসনে এগিয়ে আছে বামপন্থি সিপিএম ও কংগ্রেস এবং ২টি আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের এই দীর্ঘ শাসনকাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে—

দুর্নীতি

তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘কাট মানি' সংস্কৃতি এবং সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে যে, নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসা—সবক্ষেত্রেই শাসকদলের ‘সিন্ডিকেট’-কে কমিশন বা ‘তোলা’ দিতে হয়। এটি রাজ্যের ব্যবসায়িক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন বণ্টন ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এরমধ্যে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মমতার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ও সোনা উদ্ধার এই অভিযোগকে আরও পোক্ত করেছে।

অন্যদিকে সারদা ও রোজ ভ্যালির মতো চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে শাসকদলের একাধিক নেতার নাম জড়িয়েছে। এছাড়াও রেশন বণ্টন ব্যবস্থা এবং কয়লা ও বালু পাচার নিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা- ইডি ও সিবিআইয়ের তদন্তে শাসকদলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নাম উঠে এসেছে।

যদিও কন্যাশ্রী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো জনমুখী প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামীণ ও মহিলা ভোটারদের মধ্যে শক্তিশালী ভিত্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, তবুও দুর্ণীতি তার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

রাজ্যে নারী নিরাপত্তা ও অপরাধের হার নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে আরজি কর হাসপাতালের মতো ঘটনা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো প্রশাসনের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক বছরেগুলোতে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় ব্যাপক রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে সমালোচকরা মনে করেন।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের আরজি কর কাণ্ডের পর হাসপাতালের প্রশাসনিক স্তরে এবং মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকি সংস্কৃতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বেকারত্ব ও শিল্পায়ন

১৫ বছর পার হলেও রাজ্যে বড় ধরনের বেসরকারি বিনিয়োগ বা বড় শিল্প কারখনা স্থাপন হয়নি। ফলে দক্ষ শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থানের জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে এবং এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিপুল ঋণ

২০১১ সালে যেখানে রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার নিচে। মমতার সরকারে গত ১৫ বছরে শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ গুণ বেড়ে ৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা রাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সঙ্গে এক সময়ের শিল্পোন্নত এই রাজ্যের মাথাপিছু আয় বর্তমানে রাজস্থান বা ওড়িশার মতো রাজ্যের নিচে নেমে গেছে বলে কিছু অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

তোষণ ও মেরুকরণ

বিজেপির অভিযোগ, ভোটব্যাংকের রাজনীতির কারণে সরকারের বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি অতি-তোষণের নীতি অন্য অংশের মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে, যা রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সমীকরণকে প্রভাবিত করেছে।

এছাড়াও সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশাসনের শিথিলতা ও পরিচয়পত্র তৈরিতে সহায়তার অভিযোগগুলো জাতীয় নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে সমালোচিত হয়েছে।

তৃণমূলের অভিযোগ কী?

এদিকে নির্বাচনের এই ভরাডুবির জন্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবকে দায়ী করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মী ও অনেক বিশ্লেষক।  

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করে আসছেন; এসআইআরের মাধ্যমে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।

তৃণমূলের দাবি, মূলত সীমান্ত জেলা এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে (যেমন- মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনা) মুসলিম ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির ভোটারদের টার্গেট করে বাদ দেওয়া হচ্ছে। 

মূলত, রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে অন্তত ১১২টি আসনে মুসলিম ভোটাররা জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ৫০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এমন ৪৩টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের আধিপত্য গতবারের তুলনায় অনেকটা কমেছে- বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে, যা সরাসরি তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান কমিয়ে দিচ্ছে এবং কোথাও কোথাও বিজেপিকে সুবিধা করে দিচ্ছে। 

 

এমএইচআর