Dhaka Mail Logo

হেলথ

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ বাড়ছে, নিষ্পত্তিতে ধীরগতি

সাখাওয়াত হোসাইন

২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

  • অভিযোগ বাড়ছে, নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা
  • চিকিৎসায় আস্থাহীনতায় বাড়ছে বিদেশমুখিতা
  • শাস্তি হলেও নেই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা
  • দুই বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে অভিযোগ

দীর্ঘ ১৪ বছর সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন সিলেটের প্রবাসী ইদ্রিস আলী ও নাজমা বেগম দম্পতি। অবশেষে গর্ভবতী হন নাজমা বেগম। গত ৮ অক্টোবর শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তাঁকে সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের চাওয়া ছিল, স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্ম না নিলে অস্ত্রোপচার করা হবে, তাতে তাঁদের আপত্তি নেই।

৯ অক্টোবর নাজমা বেগমকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। রোগীর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তাঁদের বলা হয়, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রিজওয়ানা মির্জার নির্দেশনায় রোগীকে দেখা হচ্ছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পরিবারকে জানানো হয়, স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্ম নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া নবজাতককে দেখতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, শিশুটি মৃত। পরিবারের অভিযোগ, নবজাতকের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথার পেছনের অংশে দুটি জায়গায় কাটা এবং চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত ঝরছিল।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রায়ই চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠে। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। বিচার চাইতে গিয়ে তাঁদের দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। কখনো ভয়ভীতি বা হুমকির শিকার হতে হয়, আবার অনেকে মুখ খুলতেও সাহস পান না।

চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াতেও রয়েছে ধীরগতি। প্রশাসনিক জটিলতা ও নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকছে অভিযোগের নিষ্পত্তি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতের তদারকি জোরদার এবং মানুষের আস্থা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিএমডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ জমা পড়ার হার বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযোগ জমা পড়েছে ৪৩টি। ২০১০ সাল থেকে গত ১৬ বছরে সংস্থাটিতে মোট ২৩৮টি অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৩টির। বাকি অভিযোগগুলো এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

অভিযোগের নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি শাস্তির ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ছয় মাস থেকে এক বছরের জন্য নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। মেয়াদ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আবার চিকিৎসাসেবায় ফিরে যান। দীর্ঘমেয়াদি বা অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা না থাকায় ভুক্তভোগীদের অনেকে সন্তুষ্ট হতে পারেন না।

জানতে চাইলে বিএমডিসির এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, সংস্থাটিতে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর নিষ্পত্তির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেকের সেই ধৈর্য থাকে না। কেউ কেউ ক্ষতি বা আক্ষেপ ভুলে নতুন করে ঝামেলায় জড়াতে চান না। ফলে অনেক অভিযোগেরই শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয় না।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, একটি অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি কমিটির মধ্য দিয়ে একাধিক প্রশাসনিক ধাপ পার হতে হয়। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তের কাজেও অনেক সময় বিলম্ব হয়। প্রয়োজনীয় জনবল ও স্বতন্ত্র তদন্ত কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে অভিযোগের জট দ্রুত কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বিএমডিসির জটিল ও ধীরগতির বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অনেকে একসময় সুবিচারের আশা ছেড়ে চুপ হয়ে যান।

আস্থার সংকটে বিদেশমুখী রোগী

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং রোগ নির্ণয়ের মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গেছেন। দেশটিতে যাওয়া মোট বিদেশি চিকিৎসা পর্যটকের প্রায় ৫২ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি। ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে চিকিৎসা নিতে যান বাংলাদেশের অনেক রোগী।

১০ বছর আগেও প্রতিবছর দুই থেকে তিন লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে এ সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।

বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর পরিমাণও বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বৈধ পথে পাঠানো হয়েছিল ৩৪ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ চার বছরে বৈধ পথে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পাঠানো অর্থ প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং রোগীদের আস্থার সংকট দূর করা গেলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। তাঁর মতে, দেশের রোগীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে দেশেই চিকিৎসায় সন্তুষ্ট রাখতে হলে স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।

তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, চিকিৎসার মানোন্নয়নের মধ্যে রয়েছে রোগ নির্ণয়ের উন্নতি, চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসক-রোগীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা। অনেক ব্যস্ত চিকিৎসক বা হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসকেরা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে রোগীর অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বিস্তারিত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি। কিছু বড় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে এ চর্চা থাকলেও সামগ্রিকভাবে এর প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, রোগ নির্ণয়ে ভুল কিংবা পরীক্ষার প্রতিবেদনে অসংগতির কারণে অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা ব্যাহত হয়। এ জন্য জেলা-উপজেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার মানের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসক ও পরীক্ষাগারের মধ্যে সমন্বয় এবং কার্যকর যোগাযোগ থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গ্রাম বা প্রান্তিক অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেওয়া, থাকা-খাওয়া ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবেশী দেশ ভারতের চিকিৎসাব্যয়ের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তুলনামূলক কম খরচ ও আস্থার জায়গা থেকে রোগীরা বিদেশে যান। এ প্রবণতা কমাতে চিকিৎসাব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রোগী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে।

চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগের তদন্ত ও বিচার প্রসঙ্গে ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, শুধু রোগীর মৌখিক অভিযোগ বা সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে চিকিৎসকের ভুল কিংবা অপরাধ নিশ্চিত করা যায় না। ভুল চিকিৎসা ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত এবং মৃতদেহের বিভিন্ন নমুনা ও পরীক্ষাগারের পরীক্ষা করা জরুরি। সঠিক তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা সম্ভব। এতে দোষী ও নির্দোষ চিকিৎসকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা যাবে এবং কারও প্রতি অবিচার হবে না। অপরাধ বা ভুলের ধরন অনুযায়ী শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে।

তদারকি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি

স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে তদারকি ও নজরদারির ঘাটতিকে দায়ী করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হয় না। যথাযথ তদারকি এবং চিকিৎসকদের ভুলত্রুটি তদন্তের সুযোগ না থাকায় অনেক সময় চিকিৎসকেরা দ্রুত শাস্তি বা হয়রানির শিকার হন।

চিকিৎসকদের পেশাগত মানোন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বা রিফ্রেশার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। এ ছাড়া চিকিৎসাশিক্ষায় সামাজিক বিজ্ঞান ও যোগাযোগের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় অনেক চিকিৎসক রোগীদের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন না। এতে চিকিৎসক-রোগীর মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়ে।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেন ডা. আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলেই স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, কোনো চিকিৎসকই জেনেশুনে কাউকে ন্যূনতম ক্ষতি করতে চান না। দেশের চিকিৎসকেরা আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রতিরোধ করতে চায় সরকার।

বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু অতিউৎসাহী মানুষের অতিরিক্ত প্রচারের কারণেও রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরির একটি প্রক্রিয়ার অংশ। তবে স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে সরকার কাজ করছে। মানুষ যাতে দেশেই যথাযথ চিকিৎসাসেবা পায়, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এসএইচ/এআর