images

হেলথ

রাজধানীর পথে পথে শরবত, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

মাহফুজুর রহমান

২১ মে ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

কাঠ ফাটা রোদে তীব্র গরমে তৃষ্ণা মেটাতে রাজধানীর অলিগলি থেকে ব্যস্ত সড়ক সবখানেই দেখতে পাওয়া যায় রঙিন শরবতের দোকান।

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ভ্রাম্যমাণ শরবতের দোকান। লাল, সবুজ, কমলা কিংবা দুধ-সাদা নানা রঙের শরবত দেখে স্বস্তি খুঁজছেন পথচারীরা। মাত্র ১০ থেকে ৩০ টাকায় মিলছে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানীয়। তবে বাহ্যিক স্বস্তির আড়ালে এসব শরবত এখন বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ শরবতের দোকানেই মানা হচ্ছে না ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি। রাস্তার ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, খোলা পরিবেশ এবং অপরিষ্কার পানির মধ্যেই তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে শরবত। অনেক দোকানেই একই পানির বালতিতে বারবার গ্লাস ধোয়া হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে অপরিষ্কার জগ, প্লাস্টিকের ড্রাম ও খোলা পাত্র।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো শরবতে ব্যবহৃত বরফ। বিক্রেতাদের অনেকেই জানান, তারা স্থানীয় অজ্ঞাত কারখানা বা ভ্রাম্যমাণ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বরফ কিনে আনেন। এসব বরফ কোন পানিতে তৈরি, কী পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয় কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত কিনা তা নিয়ে নেই কোনো তদারকি। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, অপরিষ্কার পানি দিয়ে তৈরি বরফে জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি থাকে। যা ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের কারণ হতে পারে।

Juice

নিউমার্কেট এলাকায় শরবত বিক্রি করছেন সবুজ। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সড়কের পাশেই বিক্রি করেন বিভিন্ন ধরনের ঠাণ্ডা শরবত। বরফের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা বরফ তৈরি করি না। প্রতিদিন সকালে একজন ডিলার এসে দোকানে দোকানে বরফ দিয়ে যান। কোথা থেকে বরফ আসে, কোন কারখানায় তৈরি হয় বা কী পানিতে বানানো হয় এসব আসলে আমরা জানি না। সবাই যেভাবে নিচ্ছে, আমরাও সেভাবেই নিচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, ‘গরমের সময় শরবতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। দিনে কয়েকবার বরফ আনতে হয়। অনেক সময় ডিলারের কাছ থেকে বড় বড় বরফের ব্লক আসে, সেগুলো ভেঙে ব্যবহার করি। কিন্তু এসব বরফ স্বাস্থ্যসম্মত কিনা, সেটা যাচাই করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। আমরা শুধু কিনে ব্যবহার করি।’

Dri

বাংলাদেশে পানি দূষণ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায়ও উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, দূষিত পানি ও জীবাণুযুক্ত উৎস থেকে তৈরি খাদ্য ও পানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

শরবতে স্বাদ বাড়ানোর জন্য অধিকাংশ দোকানেই অতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে বিট লবণ। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত বিট লবণ শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা কিংবা গ্যাস্ট্রিকের রোগীদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক সময় নিম্নমানের বা খোলা বাজারের বিট লবণও ব্যবহার করা হয়, যার মান নিয়ে থাকে প্রশ্ন।

এ ছাড়া বিভিন্ন রঙিন সিরাপ, কৃত্রিম ফ্লেভার ও নিম্নমানের চিনি ব্যবহার নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। অনেক দোকানে দেখা যায়, সারাদিন একই সিরাপ খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। এতে সহজেই মাছি, ধুলাবালি ও জীবাণু জমে যেতে পারে। প্রচণ্ড গরমে এসব উপাদান দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় কথা হয় কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। অনেকে বলছেন, গরমে তৃষ্ণার কারণে বাধ্য হয়েই রাস্তার শরবত পান করেন। তবে বেশিরভাগেরই জানা নেই এসব শরবত কীভাবে তৈরি হচ্ছে বা ব্যবহৃত পানি ও বরফ কতটা নিরাপদ।

ফার্মগেট এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানজিম আহমেদ বলেন, ‘আমরা যারা সারাদিন বাইরে থাকি, তাদের জন্য রাস্তার শরবত অনেকটা সহজলভ্য পানীয়। কিন্তু বেশিরভাগ দোকানে কোনো স্বাস্থ্যবিধি চোখে পড়ে না। শরবতের পাত্র খোলা থাকে, মাছি বসে, আবার রাস্তার ধুলাবালিও পড়ে।’

Drink

বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিব হাসান বলেন, ‘গরমের মধ্যে বাইরে চলাফেরা করলে শরীর একেবারে ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন রাস্তার পাশের ঠাণ্ডা শরবত ছাড়া অনেক সময় আর কিছু মাথায় আসে না। দামও কম, তাই সহজেই খাওয়া যায়। একই পানিতে গ্লাস ধোয়া হচ্ছে, বরফ কোথা থেকে আসে কেউ জানে না। তারপরও তৃষ্ণার কারণে মানুষ খাচ্ছে। আমার মনে হয় প্রশাসনের উচিত এসব দোকানে নিয়মিত নজরদারি করা।’

নিউমার্কেট এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘শিশুদের নিয়ে বাইরে বের হলে ওরা প্রায়ই শরবত খেতে চায়। গরমের মধ্যে নাও করতে পারি না। কোথাও কোনো ঢাকনা নেই, বরফ মাটির ওপর রাখা, আবার একই হাত দিয়ে টাকা নেওয়া ও শরবত বানানো হচ্ছে। এগুলো খুবই অস্বাস্থ্যকর। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরো বেশি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত বরফ নিশ্চিত করা, গ্লাস ও পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং খোলা পরিবেশে খাবার সংরক্ষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে গরম মৌসুমে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। খাবার ও পানীয় বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি না থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদফতর বা সিটি করপোরেশনের নজরদারি খুবই সীমিত। ফলে যেকোনো পরিবেশে যেকোনো উপাদান ব্যবহার করেই বিক্রি হচ্ছে শরবত।

ঢাকার প্রচণ্ড গরমে এক গ্লাস ঠাণ্ডা শরবত হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু সেই শরবতই যদি হয়ে ওঠে অসুস্থতার কারণ তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্ক সংকেত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এম/এফএ