প্রাণঘাতী এক রোগ ম্যালেরিয়া। এটি প্লাজমোডিয়াম নামের প্যারাসাইট বা পরজীবী জীবাণুর কারণে হয়। সংক্রমিত বাহক স্ত্রী অ্যানোফেলিস মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে তখন তার রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্রবেশ করে।
এই প্রাণঘাতী রোগ আবারও বাড়ছে দেশে। আক্রান্ত হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ। ম্যালেরিয়ার থাবায় কারো কারো মৃত্যুও হচ্ছে, কেউ ভুগছেন দীর্ঘমেয়াদে। সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী পাবর্ত্য চট্টগ্রামে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ম্যালেরিয়ার। ফলে আতঙ্কে সময় যাচ্ছে নাগরিকদের। এদিকে সবাইকে সতর্কতা ও সচেতনতার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৯৯ জন। এই সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫ জন মানুষ। মৃত্যু ও শনাক্তের শীর্ষে রয়েছে পাঁচটি জেলা। এরমধ্যে উল্লেখ্য সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে। মৃত্যু ও আক্রান্তের দিক থেকে বেশি হওয়া জেলাগুলো হলো- বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম।
তবে দেশের বিভিন্ন দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকাতে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হচ্ছে বেশি। সিলেট বিভাগের সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর ও রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামসহ বেশি কয়েকটি জেলায় এখনও ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের দাবি, পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে এই জেলাগুলো এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অনেকেই ছিলেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে। সচেতনতার অভাব ও আর্থিক সংকটে অনেকেই রয়েছেন চিকিৎসা বঞ্চিত, বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদের মানুষ। দুর্গম অঞ্চলে রোগীদের রোগ শনাক্ত হতেও সময় লাগছে। আবার মারা যাওয়া কারো কারো রোগও শনাক্ত হয়নি। সেইসঙ্গে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎপরতার অভাব।
বিজ্ঞাপন
তারা বলছেন, যেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে, সেসব এলাকাতে হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। সেইসঙ্গে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে জোর দিতে হবে। এছাড়া সময়মতো শনাক্তকরণ, চিকিৎসাপ্রাপ্তি এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাসিন্দা অমর্ত্য বর্মন। তিনি বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ঢাকা কলেজে। জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের এলাকাটা খুবই দুর্গম। অনেকেই পায়নি শিক্ষার আলো। সেইসঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ অসচেতন। মাঝে মাঝে শুনি কয়েকদিন অসুস্থ থাকার লোকজন মারা যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে নেয়ার পর অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসকও রোগ নির্ণয় করতে পারেন না। কেননা, এসব এলাকায় চিকিৎসাসেবার সেভাবে প্রসার ঘটেনি। যার ফলে অনেকেই চিকিৎসা বঞ্চিত। বিশাল সংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার অভাবে।’
একই কথা বান্দরবান জেলার বাসিন্দা রাইসুল ইসলামে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের কারো অসুখ হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হয় চট্টগ্রামে। এই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ্য অনেকেরই নেই। আবার দেখা যায় চিকিৎসার জন্য নিতে নিতে রোগী মারা যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারিভাবে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। যাতে মানুষ হাতের নাগালেই চিকিৎসা পেতে পারে। সেইসঙ্গে এসব এলাকায় অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে ম্যালেরিয়াসহ সিজনাল রোগে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।’
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবছর মে মাস থেকে আগস্ট মাসে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলক বেশি থাকে। উচ্চ ম্যালেরিয়াপ্রবণ তিন জেলা (বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজার) মোট রোগীর ৯৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। সংক্রমণ বেশি হচ্ছে জুম চাষি, কাঠুরিয়া, কয়লা শ্রমিক ও শরণার্থীদের।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার কারণে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার ম্যালেরিয়াকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়েছিল। বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ২০০৮ সাল ২০২৪ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার ৮৫ শতাংশ কমেছে।
আরও পড়ুন: দেশে হামে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা
জানতে চাইলে অধিদফতরের এমআইএস বিভাগের পরিচালক ডা. আবু আহম্মাদ আল মামুন বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রোগ্রাম, উঠান ও মশারি বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে এসব কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।’
বান্দরবান সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জেলায় ম্যালেরিয়া টেস্ট করান মোট ৪১ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ২১৯ জন পজিটিভ শনাক্ত হন। যারা জেলা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলাসহ সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সরকারি চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামার মধ্যেই ছিল। এই সময়ে বছরে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ১০ হাজার ৫২৩, ১৭ হাজার ২২৫, ৬ হাজার ১৩০, ৭ হাজার ২৯৪, ১৮ হাজার ১৯৫, ১৬ হাজার ৫৬৭ ও ১৩ হাজার ১০০ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে যথাক্রমে ৭, ৯, ৯, ৯, ১৪, ৬ ও ৬ জনের।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান ঢাকা মেইলকে বলেন, ম্যালেরিয়া কালাজ্বরের চিকিৎসা সারা বছরই দেওয়া হচ্ছে। রোগী দেশের যে কোনো হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং চিকিৎসা সব জায়গায় একই। সেইসঙ্গে ম্যালেরিয়া শনাক্ত ও চিকিৎসায় আরো তৎপরতা চালানো হবে।
জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী ইসমাঈল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ম্যালেরিয়া যত দ্রুত শনাক্ত করা যায় রোগীরা তত নিরাপদ। ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে দেরি করা যাবে না, দেরি হলেই রোগীরা অনিরাপদ হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসাও কাজ হয় না। এজন্য ম্যালেরিয়া যেসব জায়গায় বেশি শনাক্ত হচ্ছে, সেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও চিকিৎসা সহজ করে দিতে হবে। যাতে লক্ষণ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সেবা নিতে পারে।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ম্যালেরিয়া উপদ্রুত এলাকায় না গেলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম। তবে মশাবাহিত রোগের নতুন সংকটগুলো মোকাবিলায় কৌশলগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে সংক্রমণ নিয়ে দেশে প্রবেশ করা, সীমান্তে যথাযথ শনাক্ত ও নজরদারির ঘাটতি, সীমান্তবর্তী এলাকায় সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব এবং কীটতাত্ত্বিক নজরদারি ও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এসএইচ/এআরএম




