- ৭-১২ বছর বয়সী শিশুরা বেশি ধর্ষণের শিকার
- শিক্ষক, প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের হাতে শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার
দেশে শিশু নির্যাতনের চিত্র দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ১৬৫ শিশু। এদের মধ্যে শিক্ষক, গৃহকর্তা কিংবা প্রতিবেশীর লালসার শিকার হয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৬৭ শিশু।
বিজ্ঞাপন
যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার অনেক শিশুর পরিবার দরিদ্র ও অসহায় হওয়ায় তারা বিচারহীনতায় ভোগে। সমাজের প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অনেকেই এমন নির্যাতনের ঘটনা এড়িয়ে যান। গ্রামাঞ্চলে এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত তিন মাসে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, অপহরণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শিশুর পরিচিতজন বা নিকট আত্মীয় হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে ধর্ষণ মামলায় একজনের যাবজ্জীবন
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। ফলে অপরাধীরা শাস্তি পেতে দেরি হয়, কখনো পার পেয়ে যায়। এতে অপরাধপ্রবণতা কমার বদলে বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১৬৫ শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জন ছেলে শিশু বলৎকারের শিকার। একই সময়ে ১ থেকে ৬ বছর বয়সী ৪৯ শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে।
৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার। গত তিন মাসে এ বয়সী ৮৮ শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৬৫ শিশুও একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধর্ষণের পর হত্যা বা ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় ৮৮ শিশু নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ১৬ শিশুর মরদেহ নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া ২৮ শিশুকে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একই সময়ে ৭৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু রয়েছে ৩৮ জন।
এ ছাড়া শিক্ষকের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৮ শিশু। এদের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।
যেসব ধর্ষণের ঘটনা আলোচনায়
২০২৫ সালের ৫ মার্চ ৮ বছর বয়সী শিশু আছিয়া বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশু আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন বাদী হয়ে চার জনকে আসামি করে মাগুরা সদর থানায় ধর্ষণ মামলা করেন। ধর্ষণের প্রতিবাদে ও আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মাগুরাসহ সারা দেশে কঠোর আন্দোলন শুরু হয়।
আরও পড়ুন: ১১ বছরের শিশুর গর্ভে আরেক প্রাণ— ধর্ষকের শাস্তি চেয়ে ক্ষোভ হৃদয়ের
ঘটনার এক মাস পর মাগুরার চাঞ্চল্যকর আছিয়া ধর্ষণ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। একই বছরের ১৩ এপ্রিল (রোববার) আদালতে আসামি হিটু শেখসহ চার জনকে অভিযুক্ত করে এই মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে নিহত আছিয়ার ভগ্নিপতি সজীব শেখ ও তার ভাই রাতুল শেখ হত্যার হুমকি ও ভয়ভীতি এবং হিটু শেখের স্ত্রী জায়েদা খাতুনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
চলতি বছরের ১ মার্চ (রোববার) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের পর গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার হয় সাত বছরের শিশু ইরা। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেলে মারা গেলে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জড়িত খুনি ধর্ষকের কঠোর শাস্তির দাবিতে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো দেশ। শিশু ইরার ওপর বর্বরোচিত ঘটনায় সমাজের মানুষরূপী এক শ্রেণির নরপশুর ধিক্কার জানান অনেকে। এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করে। শিশুটি মারা যাওয়ার পর সে মামলা হত্যা মামলায় পরিণত হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাকিলা সুলতানা সুচনা বলেন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতরে একটি নির্জন পাহাড়ে শিশুটিকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় স্থানীয় কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। শিশুটিকে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয় বাবু শেখ। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে সে ছুরি দিয়ে তার গলা কেটে দেয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।
এছাড়াও, গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) ফরিদপুর বাখুন্ডা আশ্রায়ণ প্রকল্পে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শিশুকে গলাটিপে হত্যা করেছে ইজিবাইকচালক ইসরাফিল মৃধা। এরপর শিশুটিকে পাশের বাড়ির শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেন। এ ঘটনায় ইসরাফিল মৃধা, নাছিমা বেগম ও তাঁর ছেলে শেখ আমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আরও পড়ুন: শিক্ষকের ধর্ষণে ১২ বছর বয়সী শিশু সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, থানায় মামলা
এ ঘটনায় ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন জানান, চকলেটের লোভ দেখিয়ে গত ২৪ এপ্রিল শিশুটিকে বাখুন্ডা আশ্রায়ণ প্রকল্পের একটি পরিত্যক্ত বসতঘরে নিয়ে যান ইসরাফিল। পরে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শিশুটি মাকে সব ঘটনা বলে দেবে জানালে ইসরাফিল তাকে গলা টিপে হত্যা করেন। হত্যার পর লাশটি পাশের বাড়ির শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেন। এদিকে সেপটিক ট্যাংক থেকে গন্ধ বের হতে দেখে বাড়ির মালিক নাছিমা বেগম গত ২৮ এপ্রিল লাশটি উদ্ধার করে তাঁর দুই ছেলের সহায়তায় ড্রামে ভরে বাড়ির অদূরে বাখুন্ডা রেলস্টেশন–সংলগ্ন কলাবাগানে ফেলে দেয়।
এদিকে, বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়। মাসে গড়ে দেড় হাজার মামলা হয়, যা প্রতিদিন ৫০টির অধিক। ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৫৭১টি। ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি ও ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি মামলা হয়েছে। এর বাইরেও হাজার হাজার নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বলে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ৫৮টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে তেজগাঁও অঞ্চলে। পাশাপাশি, মিরপুরে ৪৮টি, মতিঝিলে ৪০টি, গুলশানে ৩৪টি, রমনায় ৩১টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও ওয়ারীতে ২১টি, উত্তরায় ১৭টি ও লালবাগে নথিভুক্ত হয়েছে ১৩টি শিশু নির্যাতনের মামলা।
সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়াও, শিশু নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিশু তাবাচ্ছুমকে হত্যা, প্রধান আসামি গ্রেফতার
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে নানান অবহেলার কারণে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। অপরাধের পরে আসামি গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে ওই অপরাধীরা আবার ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করেন। গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবার ভয়ে এ ধরনের অপরাধে আইনি সহযোগিতা নেয় না। আবার অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করে সমঝোতায় বাধ্য করেন। যার ফলে এমন ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা নীরবে চাপা কষ্ট নিয়ে সব মেনে নেয়। এমন ঘটনাগুলোতে সরকার শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে সাপোর্ট সেন্টার খোলা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে রেখে পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, সামাজিক অস্থিরতা শিশু নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে শিশুদের ওপর নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর বিষয়ে পুলিশ যথেষ্ট আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সব ঘটনায় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি আদালতের বিষয়। শিশুদের প্রতি সহিংসতা বা এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনা বাড়ানো খুব জরুরি।
একেএস/এআর




