images

হেলথ

জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বেসরকারি চিকিৎসা খাত

আব্দুল হাকিম

০৯ মে ২০২৬, ১২:১২ পিএম

  • দেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয় পৌঁছেছে ৭৯ শতাংশে
  • বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাব্যয় লাখ টাকা
  • বাড়ছে অতিরিক্ত টেস্ট দেওয়ার প্রবণতা
  • দরিদ্ররা আয়ের ৩৫% ব্যয় করেন চিকিৎসায়
  • প্রয়োজনেও চিকিৎসা নিতে পারেন না ১৫% মানুষ

পাবনার চাটমোহর উপজেলার পার্শডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দা মামুনুর রশীদ (৪০)। কয়েক মাস আগেও দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। যা আয় করতেন সেটা দিয়েই চলতো মামুনের সংসারের চাকা। কিন্তু ১৪ মাস আগে মামুনের গলায় দেখা দেয় টিউমার। কয়েক মাসের ব্যবধানে এখন সেই টিউমার রূপ নিয়েছে ক্যানসারে। এক সময়ের কর্মক্ষম এই যুবক হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। চিকিৎসক কেমোথেরাপি ও অপারেশনের কথা বলেছেন। এর জন্য প্রয়োজন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু চিকিৎসা করানোর টাকা নেই পরিবারের। কৃষি জমি বিক্রি এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রথম দিকে চিকিৎসা করালেও সারেনি রোগ। উল্টো নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। এখন বিনা চিকিৎসায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

কিছুদিন আগে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন মামুন। পরবর্তী সময়ে কেমোথেরাপি ও অপারেশনের কথা বলেছিলেন চিকিৎসক। এরজন্য খরচ হবে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু টাকা জোগাড় করতে পারছেন না তিনি। হাল ছেড়ে দিয়েছেন বাবা আব্দুল হাকিমও। তবে হাল ছাড়েননি মা মরিয়ম খাতুন। সাহায্যের জন্য দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। কিন্তু কোথাও মিলছে না সহযোগিতা।

শুধু মামুনুর রশীদই নয়, এভাবে জীবন বাঁচানোর তাগিদে শেষ সম্বল বিক্রি করা থেকে শুরু করে ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা নিচ্ছেন লাখ লাখ রোগী। দেশের বেসরকারি চিকিৎসা খাত যেন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগের চিকিৎসাতেও হাজার হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীদের। জরুরি বিভাগে প্রবেশের পরই শুরু হয় মোটা অংকের বিল। ভর্তি ফি, চিকিৎসক ফি, আইসিইউ চার্জ, ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার খরচ মিলিয়ে অনেক পরিবারকে ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে। কেউ কেউ চিকিৎসা বন্ধ করে বাড়ি ফিরতেও বাধ্য হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় চিকিৎসা খাতে বাণিজ্যিক প্রবণতা বাড়ছে। রোগীর সেবার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অতিরিক্ত হলেও সেখানে এখনো নিম্নআয়ের মানুষের ভরসা টিকে আছে। তবে শয্যা সংকট, চিকিৎসক সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে যান। কিন্তু ব্যয় বহন করতে গিয়ে পড়ছেন চরম সংকটে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২০২৪ সালে ৭৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছেন না। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের উচ্চ ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে ক্রমেই নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

বিআইডিএস জানিয়েছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মানুষ মাসে অন্তত একবার চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। তবে এর মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতে পারেন না, যা মোট চিকিৎসা প্রয়োজনের ৬৫ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় এই সমস্যা আরও বেশি প্রকট—গ্রামে অপূর্ণ চিকিৎসা প্রয়োজনের হার ৬৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এটি ৫৯ শতাংশ।

জেলা পর্যায়ে অপূর্ণ চিকিৎসা প্রয়োজনের হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নড়াইলে। সেখানে ৮১ শতাংশ মানুষ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা নিতে পারেননি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ, যেখানে এই হার ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম অপূর্ণ চিকিৎসা প্রয়োজন দেখা গেছে ফেনী জেলায়, যেখানে হার মাত্র ১৮ শতাংশ।

ব্যয়ের দিক থেকে গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা চিকিৎসা খাতে ব্যয় করে, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। এই ব্যয়ের বড় অংশই ওষুধ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় হয়।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা তুলনামূলকভাবে সমভাবে বণ্টিত হলেও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা মূলত ধনী শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যদিও ধনী পরিবারের মোট ব্যয় বেশি, তবে দরিদ্র পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ অনেক বেশি। দরিদ্র পরিবার তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করে, যেখানে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। এতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াশীল (regressive) প্রকৃতি স্পষ্ট হয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ব্যয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ ব্যয় হয় ওষুধের জন্য। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ ব্যয় হয় অস্ত্রোপচারে। এছাড়া রোগ নির্ণয় ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১৭ শতাংশ, শয্যা ভাড়ায় ১৬ শতাংশ, অন্যান্য খাতে ৭ শতাংশ, যাতায়াতে ৬ শতাংশ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ফি হিসেবে মাত্র ৫ শতাংশ ব্যয় হয়।

সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচ যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্যও তত বাড়বে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ানো গেলে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি উপকৃত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। তবে উচ্চতর সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে বৈষম্য রয়ে গেছে। তারপরও সামগ্রিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো বৈষম্য কমাবে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রাইভেট সেক্টরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ‘আউট অব পকেট’ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসার খরচ কমিয়ে আনতে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার দরকার। বর্তমানে অসুস্থতা আমাদের দেশের মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর কারণ তাদের চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের বাস্তবতায় সকল সেবা কেবল সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া সম্ভব না হলেও, কোন কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই খাতে পরিবর্তন আনা জরুরি।

ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ বড় হাসপাতালের ওপর নির্ভর না করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকেই মানসম্মত চিকিৎসা পায়। যদি তৃণমূল পর্যায়ের এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়, তবে মানুষের নিজের পকেট থেকে করা খরচের বোঝা কমবে। একই সঙ্গে আর্থিক বিপর্যয় থেকে তারা রক্ষা পাবে। বিত্তবানরা দেশে বা বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য রাখলেও, সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আর এই লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সংস্কার অপরিহার্য।

দরিদ্রদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন দিক চিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর প্রধান কারণ পরিবেশ দূষণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং নগরায়ণ। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। তাই সরকার ২৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে তিনটি বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা এবং জটিল গাইনি ও প্রসূতি সেবা। এই তিনটি সেবা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। কারণ এসব ক্ষেত্রে রোগীর চাপ বেশি এবং ব্যয়ও বেশি। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।  জনভোগান্তি দূর করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার বলেও জানান তিনি।

এএইচ/জেবি