শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ঢাকা

থ্যালাসেমিয়া: শুধু রোগী নয়, ভুগতে হয় পুরো পরিবারকে

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ০৮ মে ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

Health
আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। ছবি: এআই
  • দেশে সবচেয়ে বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী রংপুরে
  • থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয় ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু
  • গুরুতর রোগীদের প্রতি মাসে একাধিকবার রক্ত নিতে হয়
  • শিশুর জন্মের কয়েক মাস পর প্রকাশ পায় থ্যালাসেমিয়া

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে থ্যালাসেমিয়া। বংশগত এই রক্তরোগে শরীরে পর্যাপ্ত স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি না হওয়ায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে রক্তের লোহিত কণিকা। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হয় এবং রোগী রক্তশূন্যতা, তীব্র দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়। সচেতনতার অভাব ও সময়মতো পরীক্ষা না হওয়ায় দেশে প্রতি বছর বাড়ছে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, যা চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের যেমন নিজেকে ভুগতে হয়, তেমনি ভুগতে হয় পুরো পরিবারকে।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার (৮ মে) পালিত হচ্ছে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আর নয় আড়ালে, শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত চার বছরের শিশু রাহাদ আহমেদ। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছে চিকিৎসা নিতে। মেডিকেলেই ঢাকা মেইলের কথা হয় শিশুটির বাবা নাজমুল হাসানের। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাহাদের যখন তিন বছর বয়স, তখন হঠাৎ করে একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছোট মানুষ বেশি কথাও বলতে পারে না। শরীরটা অনেক দুর্বল আর কিছু খেতেও চায় না। পরে আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই।’

নাজমুল হাসান বলেন, ‘বাসায় কয়েক দিন চিকিৎসা করার পর হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জানতে পারি ছেলেটার থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। তাতে আমরা অনেকটা ভেঙে পড়ি। আর এমনিতেই বাবুর অসুস্থতায় অনেক টেনশন হতো।’

একই অবস্থা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ছয় বছরের শিশু তামান্না আক্তারের পরিবারের। জানতে চাইলে তার ব্যাংকার বাবা বাবুল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মেয়েটার থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ার পর থেকে আমাদের পরিবারে সবার মুখ তামান্নার দিকে। আদরের মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে কারোই ভালো লাগে না। নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী রক্ত নিতে হয়। সবাইকে চিন্তা করতে হচ্ছে এবং নিয়মিত চিকিৎসা করানোর টেনশন করতে হয়। একটু কিছু হলেই রোগ বেড়ে যাবে।’


বিজ্ঞাপন


বাবুল হোসেন বলেন, ‘যেমন রয়েছে ভোগান্তি, তেমনি রয়েছে খরচ। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয় মেয়ের চিকিৎসায়। কোনো কিছুই ফ্রি পাওয়া যায় না। সরকার এদিকে একটু নজর দিলে ভালো হতো। দেশে থ্যালাসেমিয়ার উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা দরকার। তাহলে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো একটু হলেও শান্তি পাবে এবং কষ্ট লাঘব হবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে উদ্বেগজনক হারে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতি বছর থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয় ৬ থেকে ৮ হাজার শিশু। বর্তমানে দেশে এ রোগীর সংখ্যা ৬৫ থেকে ৮০ হাজার। দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এটি মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরে ১১ দশমিক ০ শতাংশ।

দেশের বিভাগীয় হারে রংপুরে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ, এটি সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে আছে চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, খুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ঢাকায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, বরিশালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটে সবচেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া এই বাহকদের মধ্যে ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মাঝে ১২ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মাঝে ১০ দশমিক তিন শতাংশ ও ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মাঝে ১১ দশমিক তিন শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া কোনো সংক্রামক রোগ নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে জিনগতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের শরীরে এই রোগের বৈশিষ্ট্য চলে আসে। যারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক তাদের মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শিশুকাল থেকেই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যখন বাবা-মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন শুধু তখনই তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। একজন বাহক কিন্তু অন্যজন বাহক না হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

তারা বলেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধযোগ্য। বিয়ের আগে হবু স্বামী বা স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, তা সবারই জেনে নেওয়া দরকার। এজন্য বিয়ে নিবন্ধনের সময় থ্যালাসেমিয়া আছে কি না, বিষয়টি দেখা যেতে পারে। বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করে সাইপ্রাস, ইতালি ও গ্রিসের মতো দেশ থ্যালাসেমিয়া রোগী প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেলে থ্যালাসেমিয়া রোগী সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন।

আরও পড়ুন

ফের বাড়ছে ম্যালেরিয়া রোগী, সতর্কতার তাগিদ

জানতে চাইলে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ সাধারণত শিশুর জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে। আক্রান্ত শিশুর শরীর অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে হয়ে যায়, খাওয়ার রুচি কমে যায় এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। অনেক শিশুর ওজন ও উচ্চতা বয়স অনুযায়ী বাড়ে না। ঘন ঘন জ্বর, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াও সাধারণ লক্ষণ। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে মুখমণ্ডল ও হাড়ের গঠনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে চোয়াল ও কপালের হাড় অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যেতে পারে। এছাড়া লিভার ও প্লীহা বড় হয়ে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যাও তৈরি হয়। এসব কারণে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

Health2
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সতর্ক হওয়ার তাগিদ। ছবি: সংগৃহীত

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিয়মিত নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন। গুরুতর রোগীদের প্রতি মাসে একাধিকবার রক্ত নিতে হয়, যাতে শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন বজায় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে নিরাপদ রক্তের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় রোগীর পরিবারকে রক্তের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিংবা আত্মীয়-স্বজনের ওপর নির্ভর করতে হয়। জরুরি মুহূর্তে রক্ত না পেলে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আরও পড়ুন

হামের থাবায় নিভছে শিশুপ্রাণ, দিশেহারা বাবা-মা

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এম এ খানের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। সরকারের উচিত অবিলম্বে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা। বিদ্যমান থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মান (মেডিকেল ও নিরাময়) ব্যবস্থা করা উচিত। পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে যাতে আগামী পাঁচ বছরে কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম না হয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের প্রধান পদ্ধতি হলো স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম। প্রাথমিকভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপের জন্য স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম (১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের) অনতিবিলম্বে শুরু করা উচিত।

রক্তরোগ ও ব্লাড ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. আশিকুজ্জামান বলেন, দুই উপায়ে এ রোগ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। তা হলো- জিন থেরাপি, যা এখনো বাংলাদেশে শুরু হয়নি এবং আ্যলোজেনিক স্টেমসেল  ট্রান্সপ্ল্যান্ট, এ পদ্ধতিতে থ্যালাসেমিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি লাভ সম্ভব। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি ও বোনম্যারো  ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগে সফলভাবে অত্যন্ত কম খরচে অ্যালোজেনিক স্টেমসেল ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর রোগের অন্তর্নিহিত কারণ, জটিলতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ করে চিকিৎসা গ্রহণ করলে এ রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি নির্মূল করাও সম্ভব।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা চিন্তা করে এটি প্রতিরোধ করা একান্ত আবশ্যক। সেজন্য জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। আমাদের দেশে এ রোগ বাহকের হার অনেক বেশি। এ রোগের চিকিৎসা খরচও অনেক বেশি। রোগীদের অন্যান্য রোগের আশঙ্কাও থাকে।

এই চিকিৎসক বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থ্যালাসেমিয়া রোগীকে সারা জীবন ভুগতে হয়। মাসে মাসে রক্ত নেওয়া ছাড়াও নিতে হয় অন্যান্য অনেক চিকিৎসা। থ্যালাসেমিয়ার রোগীরা হৃদ্‌রোগ, যকৃতের রোগ, ডায়াবেটিস; এমনকি বন্ধ্যাত্বেও ভোগেন।

এসএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর