বিনোদন প্রতিবেদক
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
আইয়ুব বাচ্চুর নাম উচ্চারিত হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুরের যাদুকরের অবয়ব। আজ ১৮ অক্টোবর তার চলে যাওয়ার আট বছর। প্রতিবছর দিনটি ফিরে এলে ব্যান্ড মিউজিকের আঙিনায় এক গভীর শূন্যতা জেগে ওঠে। সেই শূন্যতার ভিড়ে স্মৃতির জানালা খুলেছিলেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘শিরোনামহীন’-এর প্রধান জিয়াউর রহমান জিয়া।
কনসার্ট শেষে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে ব্যান্ড সংগীতের চেনা জগতে। স্টুডিওতে টানা কয়েক দিনের রেকর্ডিংয়ের ক্লান্তি ফুরাতেই যে যার রাজ্য পা বাড়ায়। দৈনন্দিন ব্যস্ততার ভিড়ে একে অপরের খোঁজ নেওয়ার ফুসরতটুকুও হয় না। এই চেনা বাঁধাধরা প্রথা ভেঙে উল্টো পথে হেঁটেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। জন্ম দিয়েছিলেন ভিন্ন এক ধারা। জিয়া বলেন, ‘বাচ্চু ভাই আমাদের গোটা মিউজিশিয়ান সমাজ, বিশেষ করে ব্যান্ডগুলোর জন্য যা করে গেছেন, তা অতুলনীয়। আমাদের দেশের ব্যান্ডগুলোর চিত্র আমরা সবাই জানি— একটা কনসার্ট বা রেকর্ডিং শেষ হলে ব্যান্ড মেম্বারদের কোনো খোঁজখবরই থাকে না! কিন্তু বাচ্চু ভাই ছিলেন এই প্রথার সম্পূর্ণ বাইরে। উনি নিয়মিত কাজ করতেন।’
আরও বলেন, ‘বাচ্চু ভাইয়ের নিজস্ব স্টুডিও ছিল। ব্যান্ডের মেম্বারদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন সুরের জগতে ডুবে থাকতেন তিনি। এই যে একটানা কাজের মধ্যে নিজেকে সঁপে দেওয়ার প্রবণতা উনি আমাদের শিখিয়েছেন, তা থেকে আজ আমাদের অনেক কিছু রপ্ত করার আছে। নিয়মিত সাধনার কারণেই ওনার গানের ভাণ্ডার অন্য যেকোনো ব্যান্ড বা একক শিল্পীর চেয়ে এত সমৃদ্ধ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ওনার দেখানো পথ ধরে হাঁটতে পারলে আমাদের ব্যান্ড মিউজিক আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’

মঞ্চের আলো আর গিটারের সুরের আড়ালে আইয়ুব বাচ্চু কেমন মানুষ ছিলেন? প্রশ্নটা উঠতেই এক অদ্ভুত আবেগ ছুঁয়ে যায় জিয়াকে। জুনিয়রদের কাছে বাচ্চু ছিলেন নির্ভরতার আশ্রয়। স্মৃতির মণিকোঠা থেকে তিনি বের করে আনেন, ‘আমরা ওনার অনেক জুনিয়র। উনি ভীষণ আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। অতি সাধারণ কথাকেও আয়োজন করে বলতেন। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম! পরিবেশটাকে নিমিষেই জমিয়ে তোলার এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল ওনার। সিনিয়র-জুনিয়র সবাইকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারতেন।’
২০১৯ সালে ‘আমরা একটা সিনেমা বানাব’- চলচ্চিত্রের এর সংগীত পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জিয়া। গানের রেকর্ডিং ছিল বাচ্চুর স্টুডিওতে। সেখানে যাওয়ার পর রক আইকনকে স্টুডিওর কর্ণধার হিসেবে নয়, বড় ভাইয়ের মতো সহযোগিতা করেছিলেন। তিন দশক ধরে ‘শিরোনামহীন’ হাল ধরে রাখা জিয়া অকপটে স্বীকার করলেন, বাচ্চুর থেকে শিক্ষা নিয়েই নিজের ব্যান্ডকে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি। বললেন, “আমরা একটা সিনেমা বানাব’ চলচ্চিত্রের মিউজিক ডিরেকশনে কাজ করার সময় বাচ্চু ভাইয়ের স্টুডিওতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সেখানে গিয়ে ওনার যে আন্তরিক কো-অপারেশন আর প্রফেশনাল আচরণ আমি দেখেছি, তা চিরকাল মনে রাখার মতো। আমি বিগত ৩০ বছর ধরে ‘শিরোনামহীন’ ব্যান্ড চালাচ্ছি। একটি ব্যান্ডকে প্রফেশনালি কীভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়, সেই শিক্ষাটা আমাকে বহু জায়গা থেকে অর্জন করতে হয়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলব— বাচ্চু ভাই নিজে আমাদের জন্য অনেক বড় একটা ইনস্টিটিউট ছিলেন।”

তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের অনেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গান কণ্ঠে তুলছেন। গাইছেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও। সেগুলোর কোনোটা প্রশংসিত হচ্ছে, কোনোটা সমালোচিত। জিয়ার মতে বিষয়টিকে আবেগ দিয়ে না দেখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে বিচার করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রথমত একজন শিল্পী মারা যাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর পরিবারের বা উত্তরাধিকারীদের সেই গানের রয়্যালটি পাওয়ার আইনগত ও নৈতিক অধিকার থাকে। জনপ্রিয় কোনো গান কভার করে ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যম থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা নেবেন, অথচ আসল শিল্পীর পরিবারকে রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত করবেন—এটা স্পষ্টত অনৈতিক। অনুমতি ছাড়া অন্য কারও জনপ্রিয় গান কাভার করা তো কারও মৌলিক অধিকার হতে পারে না।
জিয়ার কথায়, দ্বিতীয়ত, শিল্পী একটি গানের একক মালিক নন। গানের প্রকৃত মালিক সুরকার ও গীতিকার। যেমন বাচ্চু ভাইয়ের অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টারা আজও জীবিত। গানটিকে রিমেক করা যাবে কি না, কিংবা আধুনিক ধাঁচের গানকে ফোক বা রকে রূপান্তর করা যাবে কি না— সেই অনুমতি দেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার কেবল মূল স্রষ্টার।

শিরোনামহীন প্রধান মনে করেন, একটি গান তার স্রষ্টার কাছে সন্তানের মতো। তাই স্রষ্টাদের অনুমতি ছাড়া মনগড়া রিমেক করা খুবই অনৈতিক। একটি জনপ্রিয় গান আর গুলশানের কোনো মূল্যবান জমির মধ্যে কোনো তফাত নেই; দুটোই বিপুল মূল্যের সম্পদ। তাই সেখানে অনুমতিহীন দখলদারিত্ব মেনে নেওয়া যায় না। কোনো গান ভালো না লাগলে শ্রোতারা সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু কে গান কভার পারবে আর কে পারবে না— সেই রায় দেওয়ার অধিকার কেবল গানটির মূল স্রষ্টার। জিয়া বলেন, আমার জমিতে আমি ধান চাষ করব নাকি বহুতল ভবন তুলব— তা যেমন একান্তই আমার সিদ্ধান্ত, ঠিক তেমনি নিজের সৃষ্টি করা গান আমি কাকে গাইতে দেব কিংবা কার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমঝোতায় যাব—সেটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব চয়েস। সেখানে অন্য কোনো তৃতীয় মানুষের এসে মতামত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।”
ইএইচ/আরআর