রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

‘বাচ্চু ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্টেজে পারফর্ম করা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল’

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

‘বাচ্চু ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্টেজে পারফর্ম করা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল’
একদিন চট্টগ্রামের এক তরুণ ঘর ছেড়েছিলেন গানকে ভালোবেসে। ৬০০ টাকা হাতে এসেছিলেন যাদুর শহর ঢাকায়। এরপর তিন যুগেরও বেশি সময় গিটার ও সুরে রাজধানীতে রাজত্ব শেষে ফিরে যান বন্দরনগরীতে। সেদিন আর খালি হাতে না, তার দুহাত ভর্তি ছিল ভালোবাসায়। বলছিলাম কিংবদন্তি ব্যান্ডগায়ক আইয়ুব বাচ্চুর কথা। আজ ১৮ অক্টোবর তার চলে যাওয়ার দিন। ২০১৮ সালের এই দিনে মারা যান তিনি। 

সোলসের গিটারিস্ট থেকে দেশের সংগীত অঙ্গনের মহাতারকা হওয়ার পথে যারা ছিলেন আইয়ুব বাচ্চুর ছায়াসঙ্গী; তাদের মধ্যে অন্যতম নগরবাউল ব্যান্ডের ড্রামার আহসান এলাহি ফান্টি। ড্রামস্টিকের সঙ্গে দেশসেরা এই ড্রামারের যেমন হৃদ্যতা আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গেও ছিল তেমনই। গায়কের চলে যাওয়ার দিন তার কিছুটা ভাগ করে নিয়েছেন ঢাকা মেইলের সঙ্গে। 

আইয়ুব বাচ্চুর কথা তুললেই আহসান আলি ফান্টি চলে গেলেন আশির দশকে। স্মৃতির ঝাঁপি থেকে শুরুর দিনগুলো বের করে আনলেন। বললেন, আমরা অনেক দিন একসঙ্গে কাটিয়েছি। ওনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিক থেকেই সঙ্গে ছিলাম। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ি। নিয়মিত স্টুডিওতে আড্ডা দিতাম। বাচ্চু ভাই, জেমস, আমি— একসঙ্গে সময় কাটাতাম। বাচ্চু ভাইয়ের সাঙ্গেই বেশি থাকা হতো আমার।”

785258194_10240525437012412_3889160252775987915_n

সোলসের গিটার বাদক থেকে নিজের একক ক্যারিয়ার দাঁড় করানোর দিনগুলোতেও ফান্টি ছায়ার মতো ছিলেন আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে। নগরবাউলের ড্রামার বলেন, ‘‘বাচ্চু ভাই তখন ‘সোলস’-এর গিটারিস্ট ছিলেন। একদিন আমাকে বললেন উনি একা কিছু করতে চান। কারণ সোলসে নিজের মতো জায়গা পাচ্ছিলেন না। তখন আমি পার্থকে ঢাকায় নিয়ে আনি কি-বোর্ড বাজানোর জন্য, স্বপনকে বেস গিটারিস্ট হিসেবে। শুরু হয় বাচ্চু ভাইয়ের সলো ক্যারিয়ার। তখনও এলআরবি হয়নি। আমিই সবকিছু দেখতাম। তাছাড়া প্রফেশনাল রেকর্ডিংয়ের সময়ও আমি তাঁর সঙ্গে থাকতাম।’’ 

ফিলিংস সক্রিয় হলে জেমসের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ফান্টি। আইয়ুব বাচ্চুও তখন এলআরবি নিয়ে ব্যস্ত। তবে দুই হরিহর আত্মার যোগাযোগ ছিল আগের মতোই। দুজন ছিলেন প্রতিবেশীও। কখনও সম্পর্ক, কখনও কাজ এক করে রাখত তাদের। ফান্টির কথায়, ‘আমাদের প্রফেশনাল কাজ ঠিকই চলত। আমি বাচ্চু ভাইয়ের বহু কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এর ফাঁকে আমি অন্যান্য কাজও করতাম, যেমন ফিল্মের কাজ বা অন্যান্য প্রজেক্ট। আমাদের বাসা কাছাকাছি হওয়ায় যোগাযোগটা সহজ ছিল। উনি থাকতেন মগবাজারের কাজী অফিস গলিতে, আর আমি থাকতাম মনোয়ারের গলিতে। হেঁটে যেতে মাত্র পাঁচ মিনিট লাগত! যখন ডাক পড়ত, চলে যেতাম। কাজ না থাকলেও সন্ধ্যায় আড্ডা হতো।’

সারাক্ষণ লেপ্টে থাকা মানুষ দুজন শেষ ভাগে এসে জড়িয়ে পড়েন মান অভিমানে। ছিলেন দূরে দূরে। কথাও হতো না। যা আজও আবেগ তাড়িত করে নগরবাউলের ড্রামারকে। তিনি বলেন, ‘বাচ্চু ভাই মারা যাওয়ার আগে ওনার সঙ্গে মান-অভিমান চলছিল। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ ছিল। আমি ওনাকে ফোন করতাম না, উনিও মাঝে মাঝে অন্য কাউকে দিয়ে আমাকে নক করাতেন। অভিমানের কারণে আমি কথা বলতাম না।’
মান-অভিমানের সে পালা আর সমাপ্ত হয় হয়নি বাচ্চু-ফান্টির। তার আগেই ইহজগতের পালা সমাপ্ত করেন রক আইকন। প্রিয় বদ্দার (বড় ভাই) মৃত্যুর খবরটিও ফান্টি পান টেলিভিশন খুলে। তার কথায়, ‘সেদিন আমি হঠাৎ টিভি খুলে দেখি আইয়ুব বাচ্চু ইন্তেকাল করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে ফোন করি। হাসপাতালে চলে যাই। দেখলাম কুমার বিশ্বজিৎ, হানিফ সংকেতসহ আরও অনেককে। কারও সঙ্গে কথা না বলে সোজা ওনার ছোট ভাইকে বলি, আমি বদ্দাকে শেষবারের মতো একটু দেখতে চাই। আমাকে দেখতে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি যাওয়ার ঠিক আধাঘণ্টা আগে ওনাকে ফ্রিজিং বক্সে ঢোকানো হয়। বক্সগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয় যা দুই-আড়াই ঘণ্টার আগে খোলা সম্ভব নয়। আমার হাতেও সময় ছিল না। কেননা উত্তরবঙ্গে আমাদের শো ছিল। ঢাকার বাইরে যাওয়ার ফ্লাইট ধরতে হবে। এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কিছু করার ছিল না।’

images_(75)

সেদিন গোটা দেশ যখন প্রিয় এবির শোকে কাতর তখন মঞ্চে জেমসের গলা ধরে আসছিল। বাধভাঙা কান্না আটকে দিচ্ছিল দরাজ গলা। তার ঠিক পেছনে ড্রামস্টিক হাতে ফান্টি যেন পাথর। অনুভূতিহীন দুই হাত সুরের প্রয়োজনে নাড়ছিল। আট বছর আগের সে মুহূর্ত খুব কঠিন ছিল বলে জানালেন ফান্টি। বললেন, ‘খুব কষ্টকর ছিল সে মুহূর্ত। বাচ্চু ভাই মারা যাওয়ার পর ওই অবস্থায় স্টেজে পারফর্ম করা আমার জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। জেমসেরও শোকাতর হওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল। কারণ আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিতাম, সময় কাটাতাম, কলিগ-ভাই- বন্ধু ছিলাম। মন বলে তো একটা ব্যাপার আছে! আমরা কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কারণ আগে থেকেই কনসার্টের কথা দেওয়া ছিল, স্টেডিয়ামে সাউন্ড-লাইট ও সব ধরনের অ্যারেঞ্জমেন্ট করা ছিল। সাধারণ শো হলে ইগনোর করা যেত, কিন্তু বিশাল আয়োজন এড়ানোর উপায় ছিল না।’

তুখোড় এ ড্রামারের কথায় উঠে এলো আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা। বললেন, ‘হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ছিল যাদের সঙ্গে বাচ্চু ভাই সবসময় এটাচড থাকতেন। আমি তাদের একজন। এমন কোনো দিন নেই কথা হতো না, একসঙ্গে থাকতাম না। ওনার প্র্যাক্টিস প্যাড আমাদের জন্য একটা ক্লাবের মতো ছিল, যেখানে আমরা কাজ না থাকলে আড্ডা দিতাম, সময় কাটাতাম।’ 

মিউজিশিয়ান হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আহসান এলাহি ফান্টির। কিন্তু মূল্যায়ন করার ভাষা নেই। বলেন, ‘একজন সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে হিসেবে উনাকে আমি কীভাবে মূল্যায়ন করব? এত উচ্চমার্গের একজন মিউজিশিয়ান যাকে নিয়ে বলার মতো ভাষা আমার নেই। এটা উপলব্ধি করার বিষয়, মুখে প্রকাশের না।’ 

759809870_10240173691578996_2288737299397985347_n

তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের অনেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গান কণ্ঠে তুলছেন। গাইছেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও। সেগুলোর কোনোটা প্রশংসিত হচ্ছে, কোনোটা সমালোচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কে কী বলল,আমি এত বুঝি না! তবে বিশ্বের সব বিখ্যাত শিল্পীর গান অন্যেরা কভার করে। আমার মতে সুযোগটা থাকা উচিত। কেউ ভালো, কেউ খারাপ গাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সবার গাওয়ার মাধ্যমেই তিনি বেঁচে থাকবেন।’ 

আহসান এলাহি ফান্টি মনে করেন সংগীত সবার জন্য উন্মুক্ত। সবাই ভালোভাবে গাইতে পারলে খুবই ভালো। এতে আইয়ুব বাচ্চুর গানগুলো আরও ছড়িয়ে পড়বে। তাছাড়া যারা গাইছে তারা গায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই গাইছে বলে মনে করেন তিনি। 

আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর