আজ ১৮ অক্টোবর— ব্যান্ড সংগীতের আকাশের অপরাজিত ধ্রুবতারা আইয়ুব বাচ্চুর চলে যাওয়ার দিন। রূপালি গিটারের তারগুলো চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার দিন। প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ফিরে এলে ব্যান্ড মিউজিকের আঙিনায় এক গভীর শূন্যতা জেগে ওঠে। যে মানুষটির আঙুলের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠত গিটারের তার, তিনি আচমকা পাড়ি জমিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। সুরের টানে অসুস্থতাকে পাত্তা দিতেন না আইয়ুব বাচ্চু, ক্লান্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছুটে যেতেন মঞ্চে— কথাগুলো বলেছেন বিশিষ্ট সুরকার-সংগীত পরিচালক এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিডব্যাকের অন্যতম সদস্য ফোয়াদ নাসের বাবু।
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল ফোয়াদ নাসের বাবুর। তার চোখে তিনি একজন ভালো মানুষ ও ভালো শিল্পী। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে উনি ভালো বন্ধু এবং ভালো মানুষ ছিলেন। আর আমিসহ সবার কাছে দেশের সেরা গিটারিস্ট ও সেরা মিউজিশিয়ানদের একজন। সেরা গায়কদেরও একজন ছিলেন। একইসঙ্গে দুর্দান্ত সুরকারও ছিলেন। যদিও অনেকে সুরকার হিসেবে তাঁর কথা সেভাবে বলে না। আমার চোখে আইয়ুব বাচ্চু বলতে অনেক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ।’
বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অপরিসীম বলে মনে করেন তিনি। সুর ও গানের মাধ্যমে কোটি মানুষের মন জয় করেছিলেন। তাঁর গিটারের সুর এদেশের তরুণদের গিটারিস্ট হতে অনুপ্রাণিত করেছে উল্লেখ করে ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘তাঁর গান বাংলাদেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়েছিল। যেটা তিনি রাজনীতিবিদদের মতো জোর করে বা প্রচার চালিয়ে করেননি। সুরের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করেছেন। তিনি শ্রোতাদের এমন সব গান উপহার দিয়েছেন, যা মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছে।’
বাবু আরও বলেন, ‘গিটারের জাদুকরি বাজনা দিয়ে এদেশের বহু তরুণকে গিটার বাজাতে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি। যেভাবে তাঁর গিটার মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। অন্য কোনো ইন্সট্রুমেন্ট হয়তো এভাবে আকৃষ্ট করেনি কাউকে। তাঁর মাধ্যমে দেশে একটি বিশাল গিটারিস্ট জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।’
একই মঞ্চে নিয়মিত পারফর্ম করার সুবাদে বাচ্চুর সঙ্গে দেশসেরা এই সংগীত পরিচালকের পেশাগত সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তিনি জানান, এস আই টুটুল এলআরবি ছেড়ে দিলে কিবোর্ডবাদক হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু তাঁর ওপরই ভরসা রেখেছিলেন। বললেন, “একসময় আমরা একই মঞ্চে পারফর্ম করতাম। পরে টুটুল এলআরবি ছেড়ে দিল, তখন কিবোর্ডের প্রয়োজন হলে তিনি আমাকে ডাকতেন। আমিও সানন্দে তাঁর সঙ্গে বাজাতাম। কনসার্ট বা করপোরেট শো করতাম। আমরা সর্বশেষ ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামের একটি প্রজেক্টে একসঙ্গে কাজ করেছি। আমি নিশ্চিত, তাঁর মনে আমার প্রতি একটা বিশ্বাসের জায়গা ছিল— আমি থাকলে তিনি নির্ভার থাকতে পারতেন। আমিও তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা ও ছোট ভাইয়ের চোখে দেখতাম।”
অনেকদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতা ভুগছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তাঁর হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছিল। কিন্তু গানের প্রতি ভালোবাসার কারণে সব এড়িয়ে গেছেন উল্লেখ করে বাবু বলেন, বাইরে থেকে তার মৃত্যুকে আকস্মিক মনে হলেও, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পর ডাক্তার বলেছিলেন, ‘ওনার হার্ট মাত্র ২৫ ভাগ কাজ করছিল!’ বাকি ৭৫ ভাগই কাজ করছিল না। অর্থাৎ তিনি চরম ঝুঁকিতে ছিলেন। কিন্তু তিনি বা তাঁর শরীর কেউই অসুস্থতা সহজে মেনে নিতে পারত না। অসুস্থতার জন্য শো বাতিল করে বিছানায় পড়ে থাকবেন— ভাবতেই পারতেন না। যে কারণে শরীর সায় না দিলেও রংপুরের শোয়ে গিয়েছিলেন।”
আয়িউব বাচ্চুর জীবনের শেষ কনসার্ট ছিল রংপুরে। দেশসেরা এ কিবোর্ডিস্ট বলেন, ‘শো’টি যারা দেখেছেন, তারাই বলেছেন, উনি ঠিকমতো কথাই বলতে পারছেন না, গাইবেন কীভাবে! তার তিন দিনের মাথায় চলে গেলেন। আমি মনে করি, আরেকটু সচেতন হলে হয়তো তাঁকে এভাবে হারাতে হতো না। যদিও তিনি চাইলেই কি আর সেটা পারতেন? কারণ গান তাঁর নেশা ও প্যাশন ছিল। যদি আরেকটু নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতেন, একটু বিশ্রাম নিতেন— তবে হয়তো আমরা এভাবে হারাতাম না। যারা তাঁর কাছের লোক ছিলাম, সবাই তাঁকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে উপদেশ দিতাম।’
আইয়ুব বাচ্চুর গান বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের অনেকে কণ্ঠে তুলছেন। এ নিয়ে সমালোচনার কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না ফোয়াদ নাসের বাবু। তাঁর মতে, গান মাধ্যমেই একজন শিল্পী অমর হয়ে থাকেন। বিতর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘গান কভার করা যাবে না—এই কথার সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর গানে। আজ থেকে বছর দশেক পরেও অন্য কোনো শিল্পী তাঁর গান গাইবেন। এর মাধ্যমেই নতুন প্রজন্মকে বাচ্চুকে জানবে। শ্রোতারা সেই গান শুনে নস্টালজিক হয়ে পড়বেন। সোনালী সময়ে ফিরে যাবেন। এটা সংগীতের একটি স্বাভাবিক নিয়ম। গানের মাধ্যমে একজন শিল্পী চিরকাল বেঁচে থাকেন। তবে হ্যাঁ, গান কভার করতে হলে সেটা সুন্দর ও মানসম্মত হতে হবে।’
ইএইচ/আরআর




