মো. ইনামুল হোসেন
০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
ঢালিউডের অ্যাকশন কিংদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চিত্রনায়ক জসীম। ঢাকাই সিনেমায় ফাইটের সূচনাও এ নায়কের হাত ধরে। মারকাটারি দৃশ্যে অভিনয়ের পাশাপাশি ফাইটিং প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। জসীমের ছাত্রদের কেউ আজ ঢালিউডের প্রতিষ্ঠিত খল অভিনেতা কেউ ফাইট ডিরেক্টর, কেউ স্টান্টম্যানও। মৃত্যুর দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও অ্যাকশন হিরো আজও অমর তাঁর শিষ্যদের হৃদয়ে। কেমন আছেন নায়ক জসীমের গড়া সেই ফাইটাররা— চলুন জেনে নেওয়া যাক।
জনপ্রিয় খল অভিনেতা পারভেজ গাঙ্গুয়া মারপিট ও অভিনয় শিখেছেন জসীমের কাছ থেকে। করেছেন স্ক্রিন শেয়ারও। সে অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে গাঙ্গুয়া বলেন, “মাস্তান রাজা’ সিনেমায় আমি কসাই চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। ওস্তাদ (জসীম) বলেছিল, ‘এই চরিত্রের জন্য তুমি জিন্সের জামা, প্যান্ট এবং একটা ক্যাপ কিনবে।’ কিন্তু তা না করে একটি সাদা ব্যাপারী জামা, লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবি কিনেছিলাম। কারণ ওস্তাদ যখন বলেছেন আমাকে কসাই চরিত্রে অভিনয় করতে হবে, তখন মনে পড়ে গিয়েছিল তার ‘কসাই’ সিনেমার কথা। এতে তিনি যেভাবে অভিনয় করেছিলেন আমিও তেমন করতে চেয়েছিলাম। তাই পাঞ্জাবি, লুঙ্গি কিনেছিলাম। শুটিংয়ের দিন মেকআপ নিয়ে এফডিসির ক্যান্টিনে বসে ছিলাম। কিন্তু ওস্তাদের সামনে যাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম, তিনি তো জিন্সের জামা, প্যান্ট পরে আসতে বলেছেন, আমি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে এলাম। দেখলে হয়তো শুটিং বন্ধ করে দিতে পারেন। তাই সামনে যাচ্ছিলাম না। সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আমার দৃশ্যের শুটিংয়ের কল হয়। এরমধ্যে নানা ছলচাতুরি করে ওস্তাদকে আমার কস্টিউমের কথা ভুলিয়ে দিই। আগে থেকে সংলাপ মুখস্থ ছিল। অ্যাকশন বলতেই শুরু করি। ওস্তাদ আমার অভিনয় দেখে অবাক। আনন্দ প্রকাশ করতে তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘অনেক সুন্দর হয়েছে। এই দৃশ্যটা আমি স্ক্রিনে দেখব, তারপর বাকি অংশের শুটিং হবে।’ ওনার কথা মতো আমরা প্রায় ত্রিশ মিনিট বসে থাকলাম। এডিটিং শেষ হলে আমরা জহির রায়হান ল্যাবে ওই দৃশ্যটি দেখি। তখনও ওস্তাদ খুবই উল্লাস প্রকাশ করেন। ওইদিনের কথা আমি এখনও ভুলিনি।”

ফাইটারদের নিয়ে জসীম খুলেছিলেন জ্যাম্বস গ্রুপ। গাঙ্গুয়া বলেন, ‘ওস্তাদের মৃত্যুর পর গ্রুপটি বন্ধ হয়ে যায়। জসীম সাহেবের হাত ধরে আমরা অনেকেই ঢালিউডে এসেছি। ওনাকে সবসময় স্মরণ করি। যেখানেই যাই তাঁর কথা বলি। তাঁকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে, সেগুলো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিই। যতদিন বাঁচব স্যারের জন্য দোয়া করব, আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন। আমি ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়ে চলতে পারছি। অনেকেই নিজের চিকিৎসা করাতে পারছেন না।’
জসীমের হাত ধরে ঢালিউডে আসেন আরমান। চার দশকের ক্যারিয়ারে ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে অসংখ্য সিনেমায় কাজ করেছেন। অ্যাকশন শিখেছেন জসীমের থেকে। জসীমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তুলনা করা যাবে না। তাঁর যে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছিল, আমরা তাঁর মতো হতে পারব না। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি তাঁর মতো কাজ করার। তারপরও মনে হয় আমি তাঁর মতো পারিনি। তবুও সবসময় চেষ্টা করে গেছি। পাশাপাশি তাঁর আদর্শ নিয়ে পথ চলছি।’
আরমানের জীবনের বড় প্রাপ্তি জসীমের ভালোবাসা ও প্রশংসা। ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জ্বলন্ত আগুন’ সিনেমায় ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত ছিলেন আরমান। কমল সরকার পরিচালিত সিনেমাতে অভিনয় করেছেন রুবেল, আলী রাজ, প্রবীর মিত্রর মতো তারকারা। সিনেমাটি দেখে আরমানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন জসীম। বলেছিলেন, বাংলাদেশে আর কেউ হবে না ওরকম, আমি যেটা ক্রিয়েট করছি, তুমি ঠিকঠাক পারছ! আরও বলেছিলেন, আমাদের এখানে কোনোকিছু নেই, তারপরও তুমি যেগুলো করেছ তা আমার পক্ষেও সম্ভব না। আমি তোমার কাছে ঋণী! তিনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। প্রায়ই বলতেন, আমার মতো আর কেউ হবে না। আমার নাম শুনলে সবাই এক বাক্যে চিনত।

এখনকার ফাইটারদের নিয়ে হতাশা ভেসে উঠল তাঁর কণ্ঠে। বললেন, ‘নতুনদের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই এখানে। কেননা এখন সিনেমাই নির্মাণ হয় না সেভাবে। হলেও দর্শক হলবিমুখ। ইন্ডাস্ট্রি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। কাজের অভাব। ফলে জীবনের নিশ্চয়তা নেই।’
নিয়মিত কাজ না থাকায় গেল কয়েক দশকে ফাইটারদের অনেকেই শোবিজ অঙ্গন ছেড়েছেন বলে জানালেন তিনি। সেইসঙ্গে মেধার ঘাটতিও উল্লেখ করলেন। বললেন, ‘অনেকের মেধা কম থাকতে পারে। তাই সে টিকতে পারেনি। আগামীতে এই পেশা কেমন থাকবে জানি না, আমার মনে হচ্ছে না খুব একটা ভালো থাকবে।’ জসীমের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরের কাছে গিয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে মোনাজাত করেন তিনি।

জসীম জীবদ্দশায় ছাত্রদের জন্য ‘জুনিয়র জ্যাম্বস’ নামে আরও একটি ফাইটিং দল গঠন করে দিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় ২০০ জনের মতো সদস্য ছিলেন। তাঁদের একজন ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান সুমন রেজা জুম্মন। তিনি জানান জসীমের ছাত্রদের হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা সবাই অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুনদের এই পেশায় না আসার পরামর্শ তাঁর। বলেন, ‘বর্তমান নতুনদের জন্য এই পেশায় আসা একেবারেই ঠিক হবে না। কারণ এখন আর আগের মতো কাজ, সম্মান নেই। পরিশ্রমের সঠিক পারিশ্রমিকও পাওয়া যায় না। আমি নিজে কাউকে ফাইটিং ডিরেকশনে আসতে পরামর্শ দেব না। এখন যে কয়টা ছবি হয় বাজেট বেশি থাকলে বাইরে থেকে নিয়ে আসে। তাতে করে আমাদের কাজ একবারে নেই।’
জসীমের প্রতিষ্ঠিত ফাইটিং গ্রুপের সদস্য হলেও অভিনেতার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার সৌভাগ্য হয়নি জুম্মনের। তবে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। প্রশিক্ষণের সময় জসীমের হাঁটাচলা, কথা বলার ধরন এবং তাঁর মানবিকতা মুগ্ধ করত জুম্মনকে। একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ না হলেও কাছ থেকে তাঁর অভিনয় দেখেছেন। সে কথা তুলে ধরে বলেন, ‘খুব নিখুঁতভাবে কাজ করতে ভালোবাসতেন। একটা শট ১০০% পারফেক্ট না হওয়া পর্যন্ত তিনি সারাদিন ধরে সেই শট নিতে থাকতেন। মনের মতো না হলে এক শটে দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগাতেন। কিন্তু কোনো এভারেজ মানের শট রাখতেন না।’
বর্তমানে নিয়মিত কাজ না থাকায় সংসারের হাল ধরতে নিজের এলাকায় একটি ব্যবসা খুলেছেন জুম্মন। শুটিং না থাকলে সেখানে সময় দেন। সম্প্রতি একটি সিনেমার শুটিংয়ের জন্য দশ দিন গাজীপুরে ছিলেন। সেই সময় তাঁর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে আবারও দোকান চালু করার কথা জানান তিনি। জুম্মন বললেন, ‘শুটিংয়ের পাশাপাশি এলাকায় একটি ছোট ব্যবসা দিয়েছি। শুটিং থাকলে বাইরে যাই। কাজ না থাকলে দোকানে বসি। কিছুদিন আগে গাজীপুরে ১০ দিনের শুটিংয়ে ছিলাম। সিনেমার কাজ আর ছোট ব্যবসা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি।’
ইএইচ/আরআর