বিনোদন ডেস্ক
০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
‘নিঃশ্বাস কত দামি! আমি সেটা অনুধাবন করেছি হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাবা দশ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন; শেষে আমার চোখের সামনেই চলে গেলেন। একজন মানুষ সামান্য একটু বাতাসের জন্য লড়ছে, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে সেই প্রথম দেখা।’ বলছিলেন মাহফুজ নাজিম মাপেল। তিনি ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ ফিল্মের প্রযোজক। সীমিত দৈর্ঘের এই সিনেমাটি ৫ আগস্ট রাত ১২টায় (৬ আগস্ট) মুক্তি পেতে যাচ্ছে চরকিতে।
‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ নামটি পড়লে বা শুনলেই কঠিন কোনো বিষয় হবে বলে মনে হয়। কিন্তু না, প্রযোজক জানালেন, এটি নিঃশ্বাস নিতে পারা না পারার লড়াইয়ের গল্প। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ নাজিম মাপেল বলেন, ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ আমার কাছে একটা ঋণ শোধের চেষ্টা। বাবাকে যে নিঃশ্বাসটা এনে দিতে পারিনি সেটাই তুলে রাখলাম পর্দায়, যেন ছবিটা দেখে বেরিয়ে মানুষ একবার হলেও টের পায়, বুক ভরে শ্বাস নিতে পারাটা কত বড় পাওয়া।’

‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ নির্মাণ করেছেন ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদ। গল্প ও নির্মাণ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিও দেশ, পরিবেশ বা আরও বৃহৎ অর্থে পৃথিবী। পরিচালক বলেন, ‘’আমি এমন এক শহরে থাকি যেখানে বাতাসের মান প্রতিদিনের খবরের অংশ। ঢাকায় নিঃশ্বাস নেওয়া এখন আর স্বাভাবিক ঘটনা না, হিসাবের বিষয়। তাই ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’– এর পৃথিবীটা আমার কাছে কল্পবিজ্ঞান না, সামান্য এগিয়ে দেওয়া বর্তমান।’’
সীমিত দৈর্ঘ্যের সিনেমাটির নির্মাণশৈলী একটু আলাদাই। কারণ জানিয়ে নির্মাতা বলেন, ‘আমি ভরসা রেখেছি প্রতিচ্ছবিময় লম্বা স্থির ফ্রেম, কুয়াশাচ্ছন্ন বিমূর্ত দৃশ্যপট আর শব্দের ওপর। সংলাপ এখানে সামান্যই; নিঃশ্বাসের আওয়াজটাই বেশি জরুরি। দর্শকের হাতে কোনো উত্তর তুলে দিতে চাইনি। শুধু চাই, ছবি শেষ হলে তারা একবার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটা শুনুক।’

সিনেমাটির একটি চরিত্রের নাম তন্বী। প্রযোজক মাপেল এর ভাষ্যে, এই চরিত্র তার চেনা। চরিত্রটি তার মায়ের মতো। ব্যাখ্যা দিয়ে মাপেল বলেন, ‘আত্মীয়রা যখন আশা ছেড়ে দিতে বলছিল, মা তখন আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন; বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও আক্রান্ত হলেন করোনায়। কাউকে প্রাণপণে ধরে রাখা, তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শেখা, এই গল্পটা পর্দায় আসার আগে আমি নিজের ঘরে দেখে এসেছি।’
‘তূর্য (সিনেমার চরিত্র) শুয়ে আছে মুখে অক্সিজেন মাস্ক, নলটা গিয়ে মিশেছে কাচের ভেতর বন্দি ছোট্ট একটা গাছে’– সিনেমার দৃশ্যটি বর্ণনা করে মাপেল জানান, দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে তিনি তূর্যকে দেখেননি, দেখেছেন তার বাবাকে। একটু নিঃশ্বাসের জন্য সে এক নিঃশব্দ লড়াই।
এখানে তন্বী চরিত্রে অভিনয় করেছেন কাজী নওশাবা আহমেদ। সিনেমাটির চরিত্রের মধ্যে থাকা বা শুটিং সময়টা তার কাছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ আমার জীবনে একটা দারুণ উপলব্ধি। আমি যে জীবনটাকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শিখছি, সেই শেখাটাকে আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে এই কাজটা। আমি মনে করি ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ একটা প্রকৃতির দেওয়া গিফ্ট আমার জীবনে। আমার আরেকবার এই কাজে অভিনয় করতে ইচ্ছা করে, কবিতার মতো করে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে ইচ্ছা করে।’’

সিনেমায় ইমতিয়াজ বর্ষণ (অভিনয় করেছেন তূর্য চরিত্রে। তার মতে, ‘‘একটুখানি শ্বাস নেবার আশায় যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের কাব্যিক দৃশ্যকাব্য হলো ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’। আমরা মানুষেরা যে নৃশংসভাবে উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত সবুজ ধ্বংস করে চলেছি, কোনো একদিন সত্যি সত্যি অক্সিজেনের প্রাকৃতিক সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দেবে। তখন কী হবে পৃথিবীর মানুষের? এটি অদূর ভবিষ্যতের সেই শঙ্কার গল্প।’’
তবে গল্পটা আসলে পরিবেশের না, মানুষের। নির্মাতা বলেন, ‘যে পৃথিবীতে একটা গাছ মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে গাছের মরে যাওয়া মানে মানুষটারও ধীরে ধীরে মুছে যাওয়া। গাছ আমার আগের কাজেও ফিরে ফিরে এসেছে; এবার সে গাছ একটা সম্পর্কের আয়না। তূর্য আর তন্বীর ভেতর দিয়ে আমি দেখতে চেয়েছি, ভালোবাসা ঠিক কোন মুহূর্তে যত্ন থেকে জেদ হয়ে ওঠে। ধরে রাখা আর ছেড়ে দেওয়ার মাঝখানে যে সরু জায়গাটুকু, ছবিটা সেখানেই দাঁড়িয়ে।’
আরআর