নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চাপ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে উদয়নের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার ( ৩ নভেম্বর) সকালে সম্মিলিতভাবে বিক্ষোভ করে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষকের ছেলে। যিনি বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন।
এ সময় ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’, ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’- এমন বিভিন্ন দাবি ও স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকালে ৫ দফা দাবি জানায় তারা। দাবিগুলো হলো- প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের হয়রানি-হুমকি বন্ধ করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে পুনর্বহাল করা এবং ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সহপাঠীদের যৌন হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দেওয়ার প্রতিবাদ করায় ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি স্থগিত করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
একই সঙ্গে অভিযুক্তের পারিবারিক পরিচয়ের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রক্টর অফিস ও স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে । অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি তাদের।
বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া একটি অভিযোগে ছাত্রীরা জানায়, ‘অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে মেয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছে। সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়ায় তারা আতঙ্কিত। এর আগে দুবার অভিযোগ জমা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় তারা। সে সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি।’
ভুক্তভোগী এক ছাত্রী জানায়, ‘ওই ছেলে আমাকে চার বছর ধরে বিরক্ত করছে। একাধিকবার ব্যাড টাচ (খারাপ স্পর্শ) করেছে। বন্ধুদের কাছে আমার সংবেদনশীল অঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেছে। বহুবার শিক্ষকদের বলতে চেয়েছি, কিন্তু সাহস পাইনি। আপত্তিকর ছবি তৈরি করে বাইরের স্কুলগুলোতেও শেয়ার করেছে। এ বিষয়ে আমাকে মেসেজ দিয়ে প্রতিদিন অনেকে বিব্রত করছে।’
ভুক্তভোগী আরেক ছাত্রী বলে, ‘(অভিযুক্ত শিক্ষার্থী) আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে কথা বলে, অশালীন মেসেজ দিয়ে বিব্রত করে। আমাদের অনেক বন্ধুকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। পরপর এ ধরনের ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। এগুলো চাইলেও স্যারদের বলা যায় না। আগেও স্যারদের এ ধরনের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
বিক্ষোভকারী এক শিক্ষার্থী বলেছে, ‘অক্টোবরের প্রথম দিকে একদিন ক্লাস শেষে ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিকৃত ছবি ও সংশ্লিষ্ট বার্তা মুছে ফেলতে বলে। এ সময় তাকে থাপ্পড় দিয়ে সতর্কও করা হয়।’
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারকে অভিযুক্তের মা ও পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন এবং অন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারকেও চাপ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় বিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীবকে নিয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে ঢাবির প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে অ্যাসাইনড নই। স্কুল কর্তৃপক্ষই এসব বিষয় দেখবে। তবে সেখানে যাতে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, এ জন্য আমরা প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের পাঠিয়েছি। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের বাইরে রাখা হয়েছে। শিখন ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে দেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। আমি আজকেই ভিসি স্যারের কাছে যাব। এ বিষয়ে পুনরায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’
অধ্যক্ষ বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট আসার পর কোনো আপত্তি থাকলে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারবে। কোনো ধরনের অবিচার হতে দেব না। এখানে কারও হস্তক্ষেপেরও সুযোগ নেই।’
ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো পরিবারকে এ রকম চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পিতা ঢাবির বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন তার ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উল্টো তিনি অভিযোগ করেন, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন সহপাঠী তার ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে মারধর করেছে।
তিনি বলেন, ‘গত ৭ অক্টোবর তার ছেলেকে ক্লাসরুম থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী বের করে নিয়ে পলাশী ও আজিমপুর এলাকায় মারধর করে। এতে সে মারাত্মক আহত হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তার ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার(৩০ অক্টোবর) শাহবাগ থানায় তিনি একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন।
ঢাবির এই শিক্ষকের ভাষ্য, তার ছেলের সঙ্গে অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর একসময় বন্ধুত্ব ছিল। পরে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো এবং টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তার ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী, টাকা দেওয়া বন্ধ করে ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই তাকে মারধর করা হয়।
তিনি বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তার ছেলেকেও তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছিল। তবে ছেলের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বর্তমানে তারা তাকে নিয়মিত স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।
এএম