মাহফুজ উল্লাহ হিমু
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
এ অবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে শিক্ষা বোর্ড। প্রথমবার এমন ফল করা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হলেও দ্বিতীয়বার শতভাগ ফেল করলে এমপিও বাতিলের সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আর যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার এমন ফল করছে, সেগুলো চালু রাখার প্রয়োজন আছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা।
শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই মাদরাসা। ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এসব মাদরাসার অনেকগুলোতে পরীক্ষার্থীও ছিল হাতে গোনা—কোথাও পাঁচ থেকে সাতজন, কোথাও আরও কম। শিক্ষার্থী কম থাকা এবং নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় ছোট মাদরাসাগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি বড় মাদরাসার সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড।
গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ বছর মোট ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। বিপরীতে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করেছে।
গত বছরের তুলনায় এবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৫ সালে ৯৮৪টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছিল। এবার সেই সংখ্যা কমে ৬৬৯টিতে নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩১৫টি। একই সময়ে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান ১৩৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১২টি।
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যেখানে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন।
মাদরাসায় ফল সবচেয়ে খারাপ
ফল বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা গেছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে। বোর্ডটির অধীন ৯ হাজার ১৪১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টির একজন শিক্ষার্থীও দাখিল পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে ৮৮টি মাদরাসার সবাই পাস করেছে।
শুধু এই ২২৬ প্রতিষ্ঠান নয়, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ফলও খারাপ। ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ১ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। ৬০৩টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং ৩ হাজার ৬০১টিতে ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। আর ৪ হাজার ৩৬৭টি প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর চিত্র তুলনামূলক ভালো। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৮ হাজার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৭টির কেউ পাস করেনি। আর ৪৯২টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। সে হিসাবে দেশের শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশই মাদরাসা।
শোকজের পর ব্যবস্থা
এমন ফলের কারণ জানতে গত ১৪ আগস্ট শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ করেছে শিক্ষা বোর্ড। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওইদিন আন্তঃশিক্ষাবোর্ড সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের জবাবের অপেক্ষা করছি। জবাব দেখে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’
আরও পড়ুন: ভোকেশনালে ফেল ৫৩ হাজার ৭৪ শিক্ষার্থী
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রথমবার এমন ফল করেছে, নাকি আগেও একই ঘটনা ঘটেছে—ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় রাখা হবে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো শতভাগ ফেল করেছে, তাদের সতর্ক করা হবে। যেসব সমস্যা ছিল, তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। আর যারা দ্বিতীয়বারের মতো শতভাগ ফেল করেছে, তাদের এমপিও বাতিলের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) সুপারিশ করা হবে। যারা টানা শতভাগ অকৃতকার্য হয়, সেসব প্রতিষ্ঠান চালু রাখার কোনো মানে হয় না।’
ছোট মাদরাসা একীভূত করার সুপারিশ
এদিকে শতভাগ ফেল করা ২২৬ মাদরাসার কারণ জানতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। আট থেকে দশটি করে মাদরাসাকে একেকটি গ্রুপে ভাগ করে ডাকা হয়। তাদের কাছে ফল খারাপ হওয়ার কারণ জানতে চাওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেছেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা মাদরাসাগুলোকে ডেকেছি। ৮ থেকে ১০টি করে মাদরাসার গ্রুপ করে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার কারণ ও মাদরাসার সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছি। আলোচনার পর আমরা একটি রিপোর্ট তৈরি করছি। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠাব।’
আরও পড়ুন: শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩১৫টি
এসব মাদরাসার পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে শিক্ষার্থী সংকটের বিষয়টিই বেশি সামনে এসেছে বলে জানান বোর্ড চেয়ারম্যান। অনেক মাদরাসায় দাখিল পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। শিক্ষার্থী কম হওয়ায় নিয়মিত ক্লাসও হচ্ছে না বলে বোর্ডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অধ্যাপক সাদেকুর রহমান বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, যেসব মাদরাসায় শতভাগ অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের বেশিরভাগে শিক্ষার্থী সংখ্যা খুবই কম। অনেকের পরীক্ষার্থীই ছিল ৫-৭ জন। এত অল্প শিক্ষার্থী হওয়ায় তারা ক্লাসেও আসে না। ক্লাস হয় না এমন মাদরাসা চালিয়ে কোনো লাভ নেই। আমরা এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বড় কোনো মাদরাসার সঙ্গে মার্জ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছি।’
এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর শোকজের জবাব পর্যালোচনা করছে সংশ্লিষ্ট বোর্ড। সেই জবাব এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের ফল বিবেচনায় নিয়ে কারও ক্ষেত্রে সতর্কতা, কারও এমপিও বাতিলের সুপারিশ এবং কম শিক্ষার্থীর মাদরাসাগুলো একীভূত করার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এমএইচ/এআর