বোরহান উদ্দিন
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
• একগুঁয়েমি ও সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত, বারবার নীতি বদলে অসন্তোষ
• বদলি-পদায়নে ঘুষ লেনদেনের বিস্তর অভিযোগ
• ভিসি নিয়োগ ও কারিকুলাম নিয়ে প্রশাসনিক হযবরল
• বেফাঁস কথাবার্তায় কাঠগড়ায় মন্ত্রী
বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন অর্থাৎ ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। যাত্রা শুরুর সময় দেড় দশকের প্রশাসনিক সংকট কাটিয়ে দেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিন্তু আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে চলা এই মন্ত্রণালয়ে গত ছয় মাসে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরবর্তীতে তীব্র চাপের মুখে পড়ে সিদ্ধান্ত বদলের ঘটনা ঘটেছে। যা সরকারকে বিব্রতও করেছে। এছাড়াও শিক্ষক-কর্মকর্তা বদলি, পছন্দের পোস্টিং দেয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনেরও বড় অভিযোগের মুখে পড়েছে এই মন্ত্রণালয়।
শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের মতামত না নেওয়ার কারণেই দফায় দফায় এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষ হতে চললেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা ফেরার বদলে তৈরি হয়েছে গভীর আস্থার সংকট।
ভর্তি পরীক্ষা বনাম লটারি: সিদ্ধান্তের অস্থিতিশীলতা
ছয় বছর আগে সরকারি-বেসরকারি স্কুলে ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস ও কোচিং নির্ভরতা কমাতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় হঠাৎ করেই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকেই আবার পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করানোর কথা জানায়। সরকারের এই ঘোষণার পর পরই অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন এবং দেশজুড়ে কোচিং বাণিজ্যের নতুন উৎসব শুরু হয়। তীব্র আপত্তি ও সমালোচনার মুখে মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত থেকে আংশিক সরে আসতে বাধ্য হয়।
নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমেই ভর্তি করা হবে, তবে অন্যান্য শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে। বারবার এমন সিদ্ধান্ত বদলে অভিভাবকদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা ও সংসদের ক্ষমা প্রার্থনা
টানা বৃষ্টি ও নজিরবিহীন জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কষ্ট নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য ঘিরে গত মাসে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা রাস্তা আটকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত একটি মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলিনি। তারপরও যদি কেউ আমার কথায় আহত হয়ে থাকেন, সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
নিয়োগ ক্ষমতা ফেরানোর আলোচনায় তীব্র সমালোচনা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ-র (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কাছ থেকে আবার পুরোনো প্রক্রিয়ায় পরিচালনা পর্ষদের (ম্যানেজিং কমিটি) হাতে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। যদিও সিদ্ধান্তের কথা মন্ত্রী অস্বীকার করলেও এ খবর চাউর হলে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। ২০০৫ সালের আইনের দোহাই দিয়ে এনটিআরসিএ-কে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রাখার প্রাথমিক সভার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো শিক্ষাঙ্গণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ নিয়ে দ্রুত প্রতিবাদ সমাবেশ ও আন্দোলন শুরু হয়।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্ট করতে বাধ্য হন যে, সভার আলোচনার কিছু অংশ কেটে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে এবং এটি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন নয়। তবে এর আগেই আবার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বাধীন কমিটি থেকে সরিয়ে গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে অতীতে নিয়োগ ঘিরে যে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল, তা ফের মাথাচাড়া দেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিকে বদলি নীতিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বিতর্ক
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের বদলির দায়িত্ব অনলাইন থেকে সরিয়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তবে মূল জটিলতা তৈরি হয় খসড়া নীতিমালায় বদলি কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’দের রাখার বিধান যুক্ত করায়।
অনলাইনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী বা 'গণ্যমান্য ব্যক্তিদের' যুক্ত করলে তদবির ও প্রশাসনিক দুর্নীতির পথ আরও সুগম হবে—এমন আশঙ্কায় শিক্ষক সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে ১৮ জুলাই নীতিমালা সংশোধন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘শিক্ষানুরাগী বা বিদ্যোৎসাহী’ ব্যক্তি যুক্ত করে সাতটি নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।
কারিকুলাম ও ভিসি নিয়োগে বিশৃঙ্খলা
চলতি বছরের মার্চে আধুনিক ও যুগোপযোগী নতুন কারিকুলাম তৈরির বড় বড় ঘোষণা দেওয়া হলেও ছয় মাস শেষে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। নতুন কারিকুলাম না বানিয়ে এখন বাতিল হওয়া ২০১২ ও ২০২২ সালের কারিকুলামকেই ঘষামাজা ও সংশোধন করে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালুর কথা জানানো হচ্ছে। শিক্ষা বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার একদম বিপরীতমুখী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন।
অন্যদিকে দেশের তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোয়াখালী, মাওলানা ভাসানী ও সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) আইন তোয়াক্কা না করে আল-হাদিস, মার্কেটিং এবং সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপকদের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে শিক্ষক সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া দুই বছর ধরে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলায় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও নির্বাচিত কমিটি গঠনের উদ্যোগ না নিয়ে অ্যাডহক কমিটিতে দলীয় লোকদের বসানোর অভিযোগ উঠছে।
এপিএস অপসারণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা কতটা ভঙ্গুর তা স্পষ্ট হয় শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানের কাণ্ডে। বদলি ও তদবির বাণিজ্যের নানামুখী অভিযোগের মুখে তাকে এপিএস পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে প্রেষণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উচ্চপদে বসানো হলে সেখানেও বিতর্ক তৈরি হয় এবং বাধ্য হয়ে সরকার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় সেই নিয়োগ বাতিল করতে বাধ্য হয়।
সামগ্রিক বিষয়ে অভিভাবকদের শীর্ষ সংগঠন 'অভিভাবক ঐক্য ফোরাম'-এর সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘লটারি ভর্তি বা এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ফলে শিক্ষায় যে স্বচ্ছতা এসেছিল, হঠাৎ করে তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া ঠিক হবে না। সিদ্ধান্ত না বদলে মনিটরিং জোরদার করা উচিত।’
একই বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর পেছনে কিছু রাজনৈতিক চাপ আর কিছুটা দায়িত্বহীনতা ও অদক্ষতা কাজ করছে। তাড়াহুড়ো না করে দীর্ঘমেয়াদী এবং সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’
যদিও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভাষ্য, ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকার যখন বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন সামান্য বিষয় নিয়ে অহেতুক আন্দোলন উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে ছয় মাস শেষে শিক্ষাঙ্গনে স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা আনার বদলে বিতর্ক আর সিদ্ধান্ত বদলের এই ধারা মন্ত্রণালয়ের দক্ষতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিইউ/এআরএম