নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ জুন ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের পথে দুর্নীতি, অপচয়, পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল তদারকিই প্রধান অন্তরায়। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও তার কাঙ্ক্ষিত সুফল অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায় না।
শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা বাজেট বিষয়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফল প্রকাশে এমন চিত্র তুলে ধরে শিক্ষা অধিকার সংসদ।
জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সংগঠনটির সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, শিক্ষা খাতে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা হলো দুর্নীতি ও অপচয়। বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল জবাবদিহিতাও শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এ জরিপ পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ ছিলেন স্নাতক পর্যায়ের এবং ৩৬ শতাংশ ছিলেন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী মত দিয়েছেন যে, শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বা তার বেশি বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, বর্তমান বরাদ্দ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার চাহিদা এবং উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, শিক্ষার্থীরা মনে করেন শিক্ষা খাতে কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং সেই অর্থ যেন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বাজেটের আকার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব হবে না।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষাকে। তাদের মতে, শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী না হলে উচ্চশিক্ষাসহ অন্যান্য স্তরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, শিক্ষার প্রতিটি স্তরের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত না হলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা কঠিন হবে।
জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
তাদের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে শিক্ষা বাজেটে এসব খাতের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দেশের তরুণরা পিছিয়ে পড়তে পারেন।
আরও পড়ুন
সরকারি বাজেটে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ হবে: শিক্ষামন্ত্রী
সংকটের অর্থনীতিতে স্বপ্নের বাজেট, হিসাব মিলবে তো?
গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সুপারিশ ছিল দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ। অংশগ্রহণকারীরা জানান, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানসম্মত শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের ব্যবধান কমাতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকার শিক্ষা খাতের গুরুত্বের কথা বললেও বাস্তবে বাজেটে তুলনামূলক কম বরাদ্দ দিয়েছে। জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় ২ শতাংশ বা তারও নিচে অবস্থান করছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং দেশের প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
চন্দন বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা হলো এমন একটি শিক্ষা বাজেট, যা শুধু বরাদ্দের পরিমাণে বড় হবে না, বরং দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। কারণ শিক্ষা খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা অধিকার সংসদের পক্ষ থেকে আবু সাদাত মো. মোস্তানসির বিল্লাহ, মিসবাহুর রহমান আসিম, মাহফুজুর রহমান মানিক ও মাজহারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
এএইচ/জেবি