নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা প্রকাশ করে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাড়তি সময়কে প্রস্তুতির কাজে লাগাতে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে সরকার। উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার লক্ষ্যও রয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। ইআরএফ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ বাংলাদেশ পার করেছে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তিন বছর সময় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও বাংলাদেশকে বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমি খুবই আশাবাদী, সামনের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহে আমরা জিনিসটার একটা নিষ্পত্তি দেখব। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা করি।
তিন বছর সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি ছিল না। অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে।
আরও পড়ুন
‘জ্বালানি খাতে ৮ মাসে ৪১২ কোটি ডলার ভর্তুকি দিয়েছে সরকার’
বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে জাপান, ১ এপ্রিল থেকে নিয়োগ শুরু
রফতানি বহুমুখীকরণে ঢাকায় বসছে ‘আন্তর্জাতিক সোর্সিং এক্সপো’
তার মতে, উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য অসুবিধা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরিতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেই বিষয়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগের কথা তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। তবে দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই আলোচনা শেষ করা উচিত।
ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও একই সঙ্গে চলবে বলে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তবে আশা করি জিএসপি প্লাসের অপশনটা আমাদের নিতে হবে না, তার আগেই আমরা এফটিএটা সম্পন্ন করব।
আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রীর ভাষ্য, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন প্রক্রিয়াগত কাজ এগোচ্ছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিরোধের স্বচ্ছ আইনি সমাধান আবশ্যক বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং রফতানির জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার— দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এত সময় ব্যয় হলে উদ্যোক্তার উদ্যম ধরে রাখা কঠিন।
এই পরিস্থিতি বদলাতে একক অনলাইন পোর্টাল থেকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে ফি পৌঁছে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদফতরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা এবং বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। বিভিন্ন সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের বদলে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর কথাও বলেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমতির জন্য উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয়ের পরিস্থিতি থেকে বের করা সম্ভব হবে।
জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননে কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বাংলাদেশ চাপে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এজন্য কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, ব্যবসা সহজ করা এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার তৈরির সমন্বিত লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে বলে জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান। ইআরএফ-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এস এস এম মঈনুল হক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
এমআর/এফএ