মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
দেশে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তিও বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তবে খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি—দুটিই বেড়েছে। অন্যদিকে, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ হলেও শিল্পের কাঁচামালে প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে সামগ্রিকভাবে এক হাজার ৩৯৪ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৮২ কোটি ডলার। সে হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলা বেড়েছে ২১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ।
একই সময়ে আমদানির বিপরীতে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে এক হাজার ২৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল এক হাজার ১২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ১২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
সামগ্রিকভাবে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি বাড়লেও বিভিন্ন আমদানি খাতে প্রবৃদ্ধির চিত্র এক রকম নয়। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে নতুন এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি—দুটিই বেড়েছে। তবে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে নিষ্পত্তি কমেছে। ফলে আমদানি ঋণপত্রের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাতভিত্তিক এই পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত সরকারের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট কিছুটা কমে আসায় আমদানিকারকদের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির সুযোগ বেড়েছে। তবে আমদানি কার্যক্রমে এই পরিবর্তনের প্রভাব সব খাতে সমানভাবে পড়েনি।
ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলা বেড়েছে সাড়ে ২৫ শতাংশ
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য ১২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলা বেড়েছে ২৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
ভোগ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার এই প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক এলসি বৃদ্ধির হারের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক আমদানি ঋণপত্র খোলার তুলনায় ভোগ্যপণ্যে নতুন এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে।
এ সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তিও বেড়েছে। জুলাই-আগস্টে এ খাতে ১০১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ, ভোগ্যপণ্যে নতুন এলসি খোলার পাশাপাশি আগে খোলা এলসির বিপরীতে নিষ্পত্তির পরিমাণও বেড়েছে। এতে এ খাতে আমদানি কার্যক্রমের উভয় পর্যায়েই প্রবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামালে এলসি খোলা বেড়েছে মাত্র ০.২১ শতাংশ
ভোগ্যপণ্যের তুলনায় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ৪২১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৪২০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
সে হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা বেড়েছে মাত্র ৯০ লাখ ডলার বা শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। সামগ্রিক এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি যেখানে ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ, সেখানে শিল্পের কাঁচামালে এই প্রবৃদ্ধি খুবই সীমিত।
তবে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তির চিত্র ভিন্ন। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ৩৮০ কোটি ২০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৮৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। এতে দেখা যাচ্ছে, নতুন এলসি খোলার পরিমাণ সামান্য বাড়লেও আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির এই বিপরীতমুখী প্রবণতা সামগ্রিক আমদানি ঋণপত্রের চিত্র থেকে আলাদা। কারণ, এ খাতে নতুন এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি যেমন সামান্য, তেমনি নিষ্পত্তির পরিমাণও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম।
মূলধনি যন্ত্রপাতিতে এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ
শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতেও নতুন এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এ খাতে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
সে হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ৪ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এ খাতে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে কিছুটা কম হলেও শিল্পের কাঁচামালের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে এ খাতে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, এ খাতেও নতুন এলসি খোলার পরিমাণ বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে।
মূলধনি যন্ত্রপাতি শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ খাতে এলসি খোলা বাড়ার পাশাপাশি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার বিষয়টি আমদানি ঋণপত্রের প্রবণতা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিনিয়োগ বা শিল্প উৎপাদনের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সামগ্রিক এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিকভাবে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি—দুটিই বেড়েছে। তবে খাতভিত্তিক হিসাবে ভোগ্যপণ্যে উভয় সূচকে প্রবৃদ্ধি থাকলেও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতিতে নিষ্পত্তি কমেছে।
ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলা বেড়েছে ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি বেড়েছে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামালে এলসি খোলা বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। বিপরীতে, নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। আর মূলধনি যন্ত্রপাতিতে এলসি খোলা বেড়েছে ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ, কিন্তু নিষ্পত্তি কমেছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট কিছুটা কমে আসায় আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে গতি ফিরেছে। তবে নতুন এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির প্রবণতা খাতভেদে আলাদা হওয়ায় আমদানি কার্যক্রমের সামগ্রিক উন্নতির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি কমার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
টিএই/এআর