শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বিলিয়ন ডলারের শিশুপণ্যের বাজার, তবুও লাখো শিশুর ‘হাহাকার’

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

বিলিয়ন ডলারের শিশুপণ্যের বাজার, তবুও লাখো শিশুর ‘হাহাকার’
  • শিশুদের ঘিরে বাড়ছে পণ্য, ব্র্যান্ড ও ভোক্তা ব্যয়
  • শিশুখাদ্যের বাজারেই হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
  • জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বেবি কেয়ার পণ্যের বাজার
  • বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে খেলনার বাজারও
  • শিশুর জন্য বাজার আছে, কিন্তু সব শিশুর ক্রয়ক্ষমতা নেই
  • পণ্যের প্রাচুর্যের বিপরীতে মৌলিক চাহিদার ঘাটতি
  • গ্রাম ও শহরের শিশুর খাদ্য প্রাপ্তিতে স্পষ্ট বৈষম্য

‘আপনার বাচ্চা খেললে আমার বাচ্চা খেতে পারবে’—সম্প্রতি ট্রেনের ভেতর খেলনা বিক্রি করতে থাকা এক ব্যাক্তির এই কথাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। কয়েকটি শব্দের এই আকুতি যেন বাংলাদেশের শিশুদের দুই ভিন্ন বাস্তবতাকে একসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছিল। একদিকে কোনো শিশুর আনন্দের জন্য কেনা হচ্ছে খেলনা, অন্যদিকে সেই খেলনা বিক্রি করা শিশুটির কাছে দিনের শেষে একমুঠো খাবার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুকে ঘিরে যখন দেশে হাজার কোটি টাকার পণ্যের বাজার বাড়ছে, তখন একই দেশের লাখো শিশুর কাছে খাবার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শৈশব এখনো অধরা। শিশুপণ্যের বাজারের এই বিস্তার তাই শুধু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গল্প নয়; এর আড়ালে আছে ক্রয়ক্ষমতার তীব্র বৈষম্যেরও একটি ছবি। যে বাজারে শিশুদের জন্য খাবার, ডায়াপার, বেবি কেয়ার সামগ্রী ও খেলনার পেছনে বাড়ছে ভোক্তা ব্যয়, সেই বাজারের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে এমন বহু শিশু, যাদের পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই প্রতিদিন হিসাব কষতে হয়।

বাংলাদেশে শিশুদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় এক ভোক্তা-বাজার। শিশুখাদ্য, ফর্মুলা মিল্ক, সিরিয়াল, বেবি ফুড, ডায়াপার, বেবি ওয়াইপস, ত্বক ও চুলের যত্নের পণ্য থেকে শুরু করে খেলনা—শিশুকে কেন্দ্র করে পণ্যের ধরন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বাজারের পরিধিও। এর মধ্যে শিশুখাদ্যের বাজার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুধের বিকল্প ও ফর্মুলা, শিশুর জন্য তৈরি সিরিয়াল, প্রস্তুত ও শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি ঘিরে দেশে এখন বড় অঙ্কের বাণিজ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের হিসাবে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের বেবি ফুড বা শিশুখাদ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত; বাজারের প্রায় ৫৮ শতাংশের দখল রয়েছে একটি বিদেশি কোম্পানির। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, মূল্য বিক্রি বাড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ থাকায় বাজারের পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি সীমিত হচ্ছে এবং আগামী বছরগুলোতে মিল্ক ফর্মুলাই সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বাড়তে থাকা ক্যাটাগরি হতে পারে।

শিশুখাদ্যের এই বাজারের বিস্তৃতি শুধু একটি পণ্যের বিক্রির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যাভ্যাস, কর্মজীবী বাবা-মায়ের সময়ের সংকট, শিশুর পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পরামর্শ, ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা এবং পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়ার প্রবণতা। বাজার গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রে ফর্মুলা মিল্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ শিশুকে কেন্দ্র করে পরিবারের ব্যয়ের একটি আলাদা খাত তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন, উদ্বেগ, অভ্যাস ও ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু একই বাজারে এমন একটি বৈপরীত্যও রয়েছে, যেখানে একটি পরিবারের কাছে শিশুর খাবারের ব্র্যান্ড, প্যাকেটের আকার ও পুষ্টিগুণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ; অন্য একটি পরিবারের কাছে প্রশ্নটি আরও মৌলিক—শিশুটি আজ পর্যাপ্ত খাবার পাবে কি না।

13

শিশুখাদ্যের বাজারেই কয়েক হাজার কোটির বাণিজ্য

বাংলাদেশে শিশুখাদ্যের বাজারের আকার নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় সংজ্ঞা ও পণ্যের পরিধিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কিছু শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাবে আমদানিনির্ভর ইনফ্যান্ট ফুড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার কয়েক হাজার কোটি টাকার পর্যায়ে রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাজারকে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি ধরে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে এসব হিসাবকে সরাসরি যোগ করে একটি একক বাজারমূল্য নির্ধারণ করা ঠিক নয়। তবে বিভিন্ন উৎসের তথ্য একসঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বাংলাদেশে শিশুদের খাবার এখন বড় একটি বাণিজ্যিক ক্যাটাগরি এবং এর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। ইউরোমনিটরের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেবি ফুড বাজারে সিংহভাগই আমদানি নির্ভর। এর মধ্যে শুধু নেসলে বাংলাদেশ প্রায় ৫৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরবর্তী বড় জায়গা দখল করে আছে বেবি নিউট্রিশন লিমিটেড, যার শেয়ার প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুখাদ্যের বাজারে বড় ব্র্যান্ডগুলোর প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী। একই সঙ্গে গবেষণাটি দেখিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার চাপ বাজারের ভলিউম বৃদ্ধিকে সীমিত করছে। শহুরে অভিভাবকদের একটি অংশ প্রিমিয়াম ফর্মুলার দিকে ঝুঁকলেও সামগ্রিক বাজারে সামর্থ্যের পার্থক্য স্পষ্ট।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুপণ্যের বাজারের প্রবৃদ্ধি মানেই সব শিশুর জীবনযাত্রার উন্নতি নয়। বাজারের হিসাব তৈরি হয় যারা পণ্য কিনতে পারে তাদের ব্যয় দিয়ে। সেখানে যে শিশু বা পরিবার বাজারের বাইরে থেকে যায়, তার উপস্থিতি বিক্রির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে শিশুপণ্যের বাজার যত বড় হচ্ছে, সেই বাজারের নাগালের বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যাও আলাদা করে দেখার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।

ফর্মুলা মিল্ক থেকে বেবি ফুড—বাড়ছে পণ্যের বৈচিত্র্য

শিশুখাদ্যের বাজারে শুধু দুধের ফর্মুলাই নয়, বয়স ও প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড ফর্মুলা, ফলো-অন ফর্মুলা, গ্রোয়িং-আপ মিল্ক, বিশেষ ধরনের ফর্মুলা, শুকনো শিশুখাদ্য ও প্রস্তুত খাবার—সব মিলিয়ে ক্যাটাগরিটি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ইউরোমনিটর বলছে, আগামী বছরগুলোতে মিল্ক ফর্মুলাই বাংলাদেশের বেবি ফুড ক্যাটাগরির সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারের এই সম্প্রসারণের পেছনে জনসংখ্যার কাঠামো যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি ভূমিকা রাখে নগরায়ণ, পরিবারের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, আয় ও ব্যয়ের ধরন এবং শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট পণ্যের চাহিদা। আধুনিক খুচরা বাজার ও অনলাইন কেনাকাটার বিস্তারও এই পণ্যগুলোকে ভোক্তার কাছে সহজলভ্য করছে। কিন্তু সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা এক বিষয় নয়। কোনো পণ্য দোকানে থাকা মানেই তা প্রতিটি শিশুর নাগালের মধ্যে থাকা নয়।

একটি শিশুর জন্মের পর তাকে ঘিরে পরিবারের ব্যয়ের তালিকাটি এখন শুধু দুধ বা খাবারে সীমাবদ্ধ নেই। ডায়াপার, ওয়াইপস, সাবান, শ্যাম্পু, ত্বকের যত্নের পণ্যসহ একাধিক পণ্য শিশুর দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহুরে পরিবারে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ বেবি কেয়ার ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে। এই বাজারের সম্প্রসারণ শিশুদের জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য ও মানের দিক থেকে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু এখানেও সামর্থ্যের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।

ডায়াপার-বেবি কেয়ারেও বাড়ছে ব্যয়

শিশুখাদ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে বেবি ও চাইল্ড-স্পেসিফিক পণ্যের আরেকটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। ডায়াপার, বেবি ওয়াইপস, ত্বকের যত্নের পণ্য, বেবি টয়লেট্রিজ, চুলের যত্নের সামগ্রী, সান কেয়ার ও অন্যান্য শিশুবান্ধব পণ্য নিয়ে এই ক্যাটাগরি বিস্তৃত হচ্ছে। ইউরোমনিটরের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এই বাজারে শীর্ষ চার নির্মাতার সম্মিলিত আধিপত্য ছিল খুবই বেশি। স্কয়ার টয়লেট্রিজ ৪১ শতাংশ, লায়ন করপোরেশন ২৫ শতাংশ, জনসন অ্যান্ড জনসন ১৯ শতাংশ এবং ম্যারিকো ১০ শতাংশ খুচরা বিক্রয়মূল্যের শেয়ার ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শুরুতে এসিআইয়ের বেবি সফটের মতো নতুন ব্র্যান্ডও বাজারে এসেছে।

অর্থাৎ একটি শিশুর জন্মের পর তাকে ঘিরে পরিবারের ব্যয়ের তালিকাটি এখন শুধু দুধ বা খাবারে সীমাবদ্ধ নেই। ডায়াপার, ওয়াইপস, সাবান, শ্যাম্পু, ত্বকের যত্নের পণ্যসহ একাধিক পণ্য শিশুর দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহুরে পরিবারে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ বেবি কেয়ার ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে। এই বাজারের সম্প্রসারণ শিশুদের জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য ও মানের দিক থেকে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু এখানেও সামর্থ্যের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।

15

খেলনার বাজারও এখন বিলিয়ন ডলারের

শিশুকে ঘিরে বাণিজ্যের আরেকটি বড় ক্ষেত্র খেলনা। বাংলাদেশ সরকারের রপ্তানি উন্নয়নসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, দেশের খেলনার বাজারের মূল্য প্রায় বিলিয়ন ডলার। দেশে প্রায় ১০০ স্থানীয় উৎপাদক এক হাজারের বেশি ধরনের খেলনা তৈরি করছে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীরা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। খেলনা শিল্পকে এখন শুধু শিশুদের বিনোদনের বাজার হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি খাত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই বাজারের বিকাশের একটি দিক হলো দেশীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়া। একসময় খেলনার বাজারে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকলেও স্থানীয় উৎপাদনকারীরা ধীরে ধীরে বাজারের বড় অংশ দখল করেছে। ফলে শিশুদের জন্য তৈরি পণ্য এখন দেশীয় শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে খেলনা উৎপাদনের সম্পর্ক, স্থানীয় উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সম্ভাবনাও এ বাজারকে অর্থনীতির একটি আলাদা অংশে পরিণত করেছে। তবে খেলনা শিশুর মৌলিক প্রয়োজন নয়। একটি শিশুর জন্য খেলনা আনন্দ, বিকাশ ও সৃজনশীলতার অংশ হতে পারে, কিন্তু খাবার, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিচয় তার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। আর এখানেই শিশুপণ্যের বাজারের গল্পটি গিয়ে মিশে যায় বাংলাদেশের শিশুদের আরেক বাস্তবতায়।

বাজার বাড়ছে, কিন্তু সব শিশুর কাছে সেই বাজার পৌঁছায় না

একদিকে শিশুদের জন্য খাবার, দুধ, ডায়াপার, বেবি কেয়ার পণ্য ও খেলনার বাজার বড় হচ্ছে; নতুন ব্র্যান্ড আসছে, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ছে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে, অনলাইন ও আধুনিক খুচরা বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। শিশুকে কেন্দ্র করে পরিবারের ভোক্তা ব্যয়ও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্তরে। কিন্তু অন্যদিকে দেশের এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যেখানে শিশুর জন্য আলাদা করে বাজার করার সুযোগই নেই। সেখানে শিশুর খাবার বলতে পরিবারের সবার জন্য রান্না হওয়া খাবার থেকে শিশুর ভাগ, কখনো তারও কম। কোনো কোনো ঘরে দিনের খাবার কমে গেলে প্রথমেই কমে যায় শিশুর প্লেটে থাকা খাবারের বৈচিত্র্য।

14

একদিকে শিশুকে ঘিরে যেমন দেশে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সেই শিশুরাই বঞ্চনার মধ্যে বেড়ে উঠছে। কোনো শিশু দোকানের কাচের ভেতর সাজানো দুধ, সিরিয়াল, বিস্কুট কিংবা খেলনার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু পরিবারের হাতে থাকে না তা কেনার মতো টাকা। কোনো শিশু ডায়াপার বা শিশুর যত্নের পণ্যের বাজারের ভোক্তা নয়; তার জীবনের বাস্তবতা হলো পুরোনো কাপড়, অনিয়মিত খাবার, অনিরাপদ বাসস্থান কিংবা কাজের খোঁজে রাস্তায় নেমে পড়া। কেউ হয়তো রাত কাটায় একটি ঘরে, কিন্তু সেই ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই; কেউ ঘুমায় ফুটপাত, স্টেশন, টার্মিনাল কিংবা খোলা জায়গায়। দিনের আলোয় যে শহর বিলিয়ন ডলারের বাজারের হিসাব করে, রাত নামলে সেই শহরেই অসংখ্য শিশুর জন্য নিরাপদ ঘুমের জায়গাটুকুও নিশ্চিত থাকে না।

শিশুর জন্য বাজার আছে, পণ্য আছে, ব্র্যান্ড আছে, বিজ্ঞাপন আছে, ক্রেতাও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব শিশুর জন্য কি সমান সুযোগ আছে? একটি শিশুর জীবন যেখানে বাজারের পণ্যের তালিকা দিয়ে শুরু হয়, আরেকটি শিশুর জীবন সেখানে শুরু হয় ক্ষুধা, অপুষ্টি, অনিশ্চয়তা কিংবা কাজের প্রয়োজন দিয়ে। এই দুই বাস্তবতা একই দেশের, একই সময়ের এবং একই বয়সী শিশুদের। বাংলাদেশের শিশুদের পরিস্থিতির দিকে তাকালে সেই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৬৪.৮ শতাংশ শিশুই খাদ্য দারিদ্র্যে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ শিশুদের খাদ্য পরিস্থিতির একটি গভীর বৈষম্য তুলে ধরেছে। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু খাদ্য দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ২১ দশমিক ১ শতাংশ গুরুতর এবং ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ মাঝারি মাত্রার খাদ্য দারিদ্র্যে। অর্থাৎ এই বয়সী প্রতি তিন শিশুর প্রায় দুইজন আগের দিন ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য পায়নি। গ্রামে এই হার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ, শহরে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে তা ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ।

খাদ্য দারিদ্র্য মানে শুধু শিশুর পেটে খাবার না থাকা নয়। একটি শিশু হয়তো কোনো খাবার খেয়েছে, কিন্তু তার খাবারে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য নেই। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠী থেকে যথেষ্ট খাবার না পাওয়া তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বাজারে শিশুর জন্য যত ধরনের পুষ্টিকর খাবারই থাকুক, দরিদ্র পরিবারের শিশুটি যদি সেগুলোর নাগাল না পায়, তাহলে বাজারের সম্প্রসারণ তার জীবনে খুব সামান্যই পরিবর্তন আনে।

দারিদ্র্য শুধু খাবারের নয়, পুরো জীবনের

শিশুর বঞ্চনাকে শুধু আয় দিয়ে মাপলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকেও সেই বাস্তবতা উঠে এসেছে। দেশে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই হার ২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই দারিদ্র্যের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, জীবনযাপনের মান, বাসস্থান ও মৌলিক সেবার একাধিক ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করে। অর্থাৎ একটি শিশু শুধু দরিদ্র পরিবারের সদস্য নয়; সে একই সঙ্গে পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সেবার একাধিক বঞ্চনার শিকার হতে পারে।

এই জায়গায় শিশুপণ্যের বাজারের সঙ্গে শিশুর দারিদ্র্যের সম্পর্কটি আরও পরিষ্কার হয়। বাজার মূলত চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু শিশুর প্রয়োজন তার পরিবারের আয় যতটুকু, তার চেয়ে অনেক বেশি। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য খাবার যেমন দরকার, তেমনি দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা, পরিচয়, নিরাপদ বাসস্থান ও সুরক্ষা। পরিবারের আয় কমে গেলে এসবের একাধিক জায়গায় একসঙ্গে চাপ পড়ে।

12

অপুষ্টির ছাপ শরীরেই

পুষ্টির ক্ষেত্রেও এই বৈষম্যের প্রভাব স্পষ্ট। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বতার শিকার, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ ওয়েস্টিং বা তীব্র অপুষ্টিজনিত ওজনহ্রাসে এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের সমস্যায় রয়েছে। একই সঙ্গে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছে এবং ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা পাওয়া গেছে। অপুষ্টি কোনো একটি দিনের সমস্যা নয়। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, অসুস্থতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি—সব মিলিয়ে একটি শিশুর শরীর ধীরে ধীরে এর প্রতিফলন বহন করে। ফলে শিশুর জন্য তৈরি বাজার যতই পুষ্টির দাবি করুক, দেশের একটি বড় অংশের শিশু এখনো মৌলিক পুষ্টির নিশ্চয়তা থেকে দূরে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু অপুষ্টিজনিত ক্ষয়রোগে (ওয়েস্টিং) ভুগছে এবং ২১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু ওজনস্বল্পতায় ভুগছে। খর্বাকৃতি ও ওজনস্বল্পতার হার শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।

তিনি আরও বলেন, ফুড ফর্টিফিকেশন বা খাদ্য সমৃদ্ধকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে এক বা একাধিক ভিটামিন বা খনিজ উপাদান নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে চালের ফর্টিফিকেশনে ছয়টি পুষ্টি উপাদান সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো হলো ভিটামিন এ, বি-১ ও বি-১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও জিঙ্ক। এ ছাড়া ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে নারী ও শিশুর ভিটামিন এর ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।

স্কুলে যাওয়ার বয়সে কাজের চাপ

শিশুর বঞ্চনার আরেকটি দৃশ্য শিক্ষা ও শ্রমের মধ্যে দেখা যায়। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় এই হার বেড়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে শিশুশ্রমের হার ১৪ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ। যারা স্কুলে যায় না, তাদের শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। শিক্ষার ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে সমন্বিত নিট উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা ৬০ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক বয়সী ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু স্কুলের বাইরে। আবার ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে।

অর্থাৎ একটি শিশুর জীবনে খাবারের ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব শুধু শরীরে থেমে থাকে না। পুষ্টির ঘাটতি, পারিবারিক আয়, স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য, পড়াশোনার পরিবেশ এবং কাজের চাপ—সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যে শিশু আজ খাবারের জন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তার কাছে আগামী দিনের শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।

পরিচয়হীনতার ঝুঁকিতেও শিশুরা

শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো তার আইনগত পরিচয়। কিন্তু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন হয়েছে। অর্থাৎ দুই শিশুর একজনের কাছাকাছি এখনো জন্ম নিবন্ধনের আওতার বাইরে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ—উন্নতি হলেও ঘাটতি রয়ে গেছে বড়। জন্মনিবন্ধন না থাকা একটি শিশুকে শুধু একটি কাগজ থেকে বঞ্চিত করে না; এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগও জড়িয়ে থাকে। সবচেয়ে প্রান্তিক পরিবারগুলোর শিশুরা যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নথিতে যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না, তখন তাদের বঞ্চনাগুলোও অনেক সময় পরিসংখ্যান ও সেবাব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।

এখানে বাজারের সঙ্গে বৈপরীত্যটি সবচেয়ে তীব্র। শহরের এক প্রান্তে শিশুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি খাবার, ডায়াপার, খেলনা ও পরিচর্যার পণ্য সাজানো থাকে; অন্য প্রান্তে এমন শিশুও রয়েছে যার কাছে রাতের খাবার নিশ্চিত নয়, ঘুমানোর জায়গা নিরাপদ নয়, এমনকি নিজের অস্তিত্বের আইনগত প্রমাণও নেই।

রাস্তায় থাকা শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি

শিশু বঞ্চনার সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্রগুলোর একটি দেখা যায় রাস্তায়। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের ‘চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশন্স ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৪ লাখের বেশি শিশু পিতামাতার যত্ন ছাড়া পথপরিস্থিতিতে রয়েছে। দেশের সব জেলা থেকে ৪০০-এর বেশি শিশুর অভিজ্ঞতা নিয়ে করা ওই গবেষণায় তাদের জীবন, কাজ, নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা ও নানা ধরনের শোষণের চিত্র উঠে এসেছে। রাস্তায় থাকা মানে শুধু একটি শিশুর মাথার ওপর ছাদ না থাকা নয়। এর অর্থ হলো অনিশ্চিত খাবার, অনিরাপদ ঘুম, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষার বাইরে থাকা, সহিংসতার আশঙ্কা এবং বিভিন্ন ধরনের শোষণের মুখোমুখি হওয়া। ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু জনসম্মুখে বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। তাদের অনেকের ঘুমানোর জন্য বিছানা, নিরাপদ দরজা কিংবা টয়লেটের মতো মৌলিক সুবিধাও থাকে না।

এখানে বাজারের সঙ্গে বৈপরীত্যটি সবচেয়ে তীব্র। শহরের এক প্রান্তে শিশুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি খাবার, ডায়াপার, খেলনা ও পরিচর্যার পণ্য সাজানো থাকে; অন্য প্রান্তে এমন শিশুও রয়েছে যার কাছে রাতের খাবার নিশ্চিত নয়, ঘুমানোর জায়গা নিরাপদ নয়, এমনকি নিজের অস্তিত্বের আইনগত প্রমাণও নেই।

সামাজিক সুরক্ষার আওতার প্রশ্ন

দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব শিশু এর সমান সুবিধা পায় না। বিশেষ করে পথপরিস্থিতির শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশু, দরিদ্র পরিবারের শিশু এবং স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হলে বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী হয়। একটি শিশুকে শুধু একবার খাদ্য বা অর্থ সহায়তা দিলেই তার দারিদ্র্য দূর হয় না; খাবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিচয়, নিরাপত্তা ও পরিবারের আয়—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। শিশুদের জন্য বাজারের পণ্য যত বাড়ছে, একই সময়ে তাদের অধিকারভিত্তিক বিনিয়োগের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। কারণ বাজার শিশুদের প্রয়োজনকে পণ্যে রূপান্তর করতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। সেই দায়িত্ব পরিবার, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের।

একই দেশের দুই শিশুর দুই পৃথিবী

বাংলাদেশের শিশুপণ্যের বাজারের গল্প তাই কেবল ব্যবসা, উৎপাদন বা ভোক্তা চাহিদার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে দেশের আয়-বৈষম্য, ক্রয়ক্ষমতার পার্থক্য এবং শিশুদের সুযোগের বৈষম্যের গল্প। এক পরিবারের শিশুর জন্য খাবারের প্যাকেটের কোন ব্র্যান্ড, কোন ফর্মুলা, কোন ডায়াপার বা কোন খেলনা ভালো—সেটি হতে পারে সিদ্ধান্তের বিষয়। আরেক পরিবারের শিশুর জন্য প্রশ্ন হতে পারে, আজ দুই বেলা খাবার হবে কি না, আগামীকাল স্কুলে যাওয়া যাবে কি না, কিংবা কাজ না করলে পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলবে কি না। একদিকে বাজার গবেষণায় শিশুখাদ্যের বিক্রি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, ফর্মুলা মিল্কের চাহিদা বাড়ছে, বেবি কেয়ারে নতুন ব্র্যান্ড আসছে, খেলনার বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু খাদ্য দারিদ্র্যের মধ্যে, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু খর্বতার শিকার, ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত এবং ৩৪ লাখের বেশি শিশু পথপরিস্থিতিতে রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো একই দেশের, একই সময়ের।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাই ‘শিশুদের বাজার’ কথাটির অর্থ নতুন করে ভাবতে হয়। একটি শিশুকে ঘিরে যত বেশি পণ্য তৈরি হচ্ছে, তার জীবন তত বেশি সুরক্ষিত হচ্ছে—এমন সরল সমীকরণ নেই। বরং বাজারের বিস্তার তখনই শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে, যখন পরিবারের আয় ও সামাজিক সুরক্ষার উন্নতির সঙ্গে শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়; যখন পুষ্টিকর খাবার শুধু দোকানের তাকেই থাকে না, দরিদ্র পরিবারের শিশুর প্লেটেও পৌঁছায়; যখন খেলনা ও বিনোদনের সুযোগের পাশাপাশি স্কুলে যাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত হয়; যখন জন্মের পর প্রতিটি শিশু রাষ্ট্রের নথিতে পরিচিত হয়; আর যখন কোনো শিশুর শৈশব পরিবারের অর্থনৈতিক সংকটের কারণে রাস্তায় বা কর্মস্থলে ঠেলে দেওয়া হয় না। শিশুকে ঘিরে বাংলাদেশের বাজার হয়তো আরও বড় হবে। নতুন পণ্য আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে, বিদেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে, খেলনা ও বেবি কেয়ারের বাজার আরও বিস্তৃত হবে। শিশুখাদ্যের চাহিদাও বাড়তে পারে। কিন্তু সেই বাজারের পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা শিশুগুলোর হিসাবও কি একই গতিতে কমবে—যারা বৈচিত্র্যময় খাবার পায় না, যারা স্কুলে যেতে পারে না, যারা কাজ করে, যাদের জন্ম নিবন্ধিত নয়, যারা রাতে নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায় না?

একটি দেশের শিশুদের নিয়ে অর্থনীতির গল্প তখনই পূর্ণ হয়, যখন বাজারের আয়তনের পাশাপাশি তাদের জীবনযাপনের মানের হিসাবও সামনে থাকে। বাংলাদেশের সামনে তাই একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা—শিশুকে ঘিরে দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্য এবং সেই বাজারের নাগালের বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশু। এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি চলতে থাকবে, নাকি একসময় তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শিশুদের অধিকার প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, শিশুর অধিকার রক্ষায় নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা যে অঙ্গীকার করেছিলাম, তা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার শিশুবান্ধব সরকার। শিশুর মতামত এবং অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিশুদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নারী ও শিশুর সার্বিক সুরক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলেই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর