নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার করে ৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ইউএজিএম বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে রফতানির দেখালেও কারখানায় উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। উৎপাদনসংশ্লিষ্ট মেশিনপত্রও পড়েছিল অব্যবহৃত অবস্থায়। বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবের সঙ্গে ঘোষিত উৎপাদনের অসংগতি পর্যালোচনা করে এই অনিয়মের চিত্র উদ্ঘাটন করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এ ঘটনায় ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে মামলা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এ পাঠানো হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর ঢাকার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের একটি প্রতিরোধমূলক দল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজিমিজি দক্ষিণ পাড়ার বি/২৪০ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত ইউএজিএম বিডি লিমিটেডে অভিযান চালায়। প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর আওতাধীন একটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় পিভিসি ফ্লেক্স, পিভিসি ফিল্ম, পেট ফিল্ম, কৃত্রিম চামড়া, ডুপ্লেক্স বোর্ড ও কালার বোর্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করত। এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন এবং পরে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে রফতানি দেখানো হতো।
অভিযানকালে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত উৎপাদনের তথ্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে ব্যাপক অসংগতি পান।
সংগৃহীত বিদ্যুৎ বিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘোষিত উৎপাদনের তুলনায় বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম।
এ ছাড়া কারখানায় বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসচালিত উৎপাদনব্যবস্থার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে ঘোষিত পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের দাবি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
অভিযানে কারখানার উৎপাদনসংশ্লিষ্ট মেশিনপত্র অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন কর্মকর্তারা।
এমনকি উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী ব্যবস্থাও কারখানার প্রোডাকশন ফ্লোরে ছিল না বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) নিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে রফতানি দেখালেও বাস্তবে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অবৈধভাবে স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি করে থাকতে পারে।
অভিযান শেষে আমদানিসংক্রান্ত তথ্য, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব, ইউপি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এতে ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে।
অধিদফতর জানায়, প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এ পাঠানো হয়েছে।
রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সুবিধার আওতায় রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা কাঁচামাল শুল্কমুক্ত বা শুল্ক সুবিধায় ব্যবহারের সুযোগ পান সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা।
তবে এ সুবিধার অপব্যবহার করে কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারায়। পাশাপাশি নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বলছে, আমদানি-রপ্তানির নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা ও কারখানার বাস্তব কার্যক্রম বিশ্লেষণের মাধ্যমে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার শনাক্ত করা সম্ভব।
রাজস্ব সুরক্ষা এবং শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ তদন্তে অধিদফতরের নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এমআর/এএম