Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ, ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে সরকারের

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

  • দুই মাসে ব্যাংকের ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ শোধ ৩ হাজার ৭২৮ কোটি
  • সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ ১২ হাজার ৮৭২ কোটি
  • রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা
  • ব্যাংক ঋণে বেসরকারি বিনিয়োগে চাপের শঙ্কা
  • রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকায় অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক কর্মসূচি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগে নেওয়া ঋণের একটি অংশও পরিশোধ করছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট—অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার মোট ১৬ হাজার ৬০১ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এর পুরোটাই নেওয়া হয়েছে তফসিলি বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া আগের ঋণের ৩ হাজার ৭২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। ফলে নতুন ঋণ নেওয়া ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের হিসাব সমন্বয় করলে প্রথম দুই মাসে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৮৭২ কোটি ১১ লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরুতেই ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভরতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় সরকারের নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে। এর সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এসব ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব থেকে পর্যাপ্ত অর্থ না আসায় ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে।

বিশেষ করে অর্থবছরের শুরুতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার পর এখন সেই ঋণের একটি অংশ পরিশোধে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে সরকারের ঋণের উৎসে পরিবর্তন হলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকনির্ভরতা কমছে না।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্সের মাধ্যমে এই অর্থ নেওয়া হয়।

ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স হলো সরকারের দৈনিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা। এটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নয়। সরকারের নগদ অর্থের প্রবাহে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে তা মেটাতে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ৯০ দিন বা তিন মাসের মধ্যে এ ধরনের ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্সের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের একটি অংশ সরকার ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি কমেছে। তবে একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

ব্যাংকে বাড়ছে টাকা, কমছে বিনিয়োগ

‘ক্যাশলেস’ লেনদেনের উল্লম্ফন, বাড়ছে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ৯০ হাজার ৩২২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের বড় অংশই এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়ছে। ফলে ঋণের উৎস বদলালেও সরকারের সামগ্রিক ব্যাংকনির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে।

শুধু ব্যাংক নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও সরকার ১ হাজার ৩১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহের চাপ অর্থবছরের শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ করলে তাদের তহবিলের একটি অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। ছবি: সংগৃহীত
বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। ছবি: সংগৃহীত

তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে তুলনামূলক বেশি তারল্য থাকায় সরকারের ঋণ নেওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের বেসরকারি ঋণ সংকট তৈরি নাও হতে পারে। ব্যাংকগুলো যখন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ পায় না, তখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।

অর্থনীতি গবেষক হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হলে ভবিষ্যতে সুদ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট নাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে থাকলে সুদ ব্যয়, ঋণের বোঝা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই গবেষক বলেন, ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ কমাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করা গেলে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন

ব্যাংকে অনাস্থা, সঞ্চয়পত্রে ফিরছেন বিনিয়োগকারীরা

পরিচালক-কর্মকর্তার নয়-ছয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে দেড় হাজার কোটির হরিলুট!

এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ওই অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয় সরকার।

২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। তার আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে এই ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের আগস্ট শেষে সেই স্থিতি আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সরকারকে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। এ কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

টিএই/জেবি