আব্দুল হাকিম
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ পিএম
# জেনারেটরে ব্যয় দেড় ১ কোটি টাকার বেশি
# এসি স্থাপনে বরাদ্দ ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা
# সোলার প্যানেলে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ লাখ টাকা
# অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংস্কারে সোয়া কোটি টাকা
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের বৈদ্যুতিক সক্ষমতা বাড়াতে ৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থই খরচ হবে সরকারি তহবিল থেকে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালনা, কমিটি, মনিটরিং, দরপত্র মূল্যায়ন ও আপ্যায়নের জন্য ৮ লাখ টাকা সম্মানী বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ শতাংশ।
পিএসসি থেকে পাঠানো পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিপিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকল্পটির পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা বিভাগে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: জমি না পেয়ে থমকে আছে সেতুর কাজ!
‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের বৈদ্যুতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদফতর, যার মেয়াদ চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ বাস্তবায়নে সময় লাগবে ১ বছর ৬ মাস। প্রকল্পটিতে বৈদেশিক ঋণ, অনুদান বা নিজস্ব অর্থের কোনো সংস্থান রাখা হয়নি।
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় যাবে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ও সরঞ্জাম স্থাপনে। ১ হাজার ২৫০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপনে ২ কোটি ৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, ৫০০ কেভিএ ডিজেল জেনারেটর কিনতে ১ কোটি ৬২ লাখ ১৭ হাজার টাকা এবং এয়ার কন্ডিশনার স্থাপনে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া ভবনের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংস্কার কাজে ১ কোটি ৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং সোলার প্যানেল স্থাপনে ৭০ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এর বাইরে পিএ ও সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনে ৫৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং কম্পাউন্ড সিকিউরিটি ও গার্ডেন লাইটে ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মূল ব্যয়ের বড় অংশই সরঞ্জাম ও অবকাঠামো তৈরিতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যয়ের বিভিন্ন খাতেও অর্থ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের ডিপিপিতে প্রচার ও বিজ্ঞাপনের জন্য ৪ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ১ লাখ টাকা এবং কম্পিউটার ও অফিস সরঞ্জাম কেনায় ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বরাদ্দকৃত সম্মানীর ৮ লাখ টাকা পিইসি, পিআইসি, প্রকল্প মনিটরিং ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রম এবং আপ্যায়ন বাবদ ব্যয় হবে।
সম্মানীর সঙ্গে প্রকল্পের অন্যান্য রাজস্ব ব্যয় যোগ করলে এই খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৭ লাখ টাকা। অথচ প্রকল্পের মূলধন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ফিজিকেল কন্টিনজেন্সি ও প্রাইস কন্টিনজেন্সি হিসেবে আরও ১৬ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর মতো কারিগরি প্রকল্পে সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কমিটির কাজ ও আপ্যায়নের জন্য ৮ লাখ টাকা সম্মানী বরাদ্দ কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদফতরের নিয়মিত জনবল ও সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। তারপরও কেন আলাদা করে সম্মানীর অর্থ বরাদ্দ?
প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ডিপিপিতে বলা হয়েছে, আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ১১ তলা বিপিএসসি সচিবালয় ভবনে সময়ের সঙ্গে বৈদ্যুতিক লোড বেড়েছে। বর্তমানে নতুন প্রিন্টিং মেশিন, এয়ার কুলারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান উপকেন্দ্রের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম। নতুন সরঞ্জাম যুক্ত হলে ভবনের সংযুক্ত লোড ১ হাজার ৯৪৬ দশমিক ৬৬৪ কিলোওয়াটে দাঁড়াবে। বিপরীতে বিদ্যমান উপকেন্দ্রের ক্ষমতা ১ হাজার ৪০ কিলোওয়াট।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন সাবস্টেশন ও জেনারেটর স্থাপনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক এয়ার কন্ডিশনার, সোলার সিস্টেম, পিএ ও সাউন্ড সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক ফিটিংস স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত ১৯ মে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতামতে প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ডিপিপি অনুযায়ী যথাযথভাবে উল্লেখ করে পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পে প্রতিটি ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পের আকার তুলনামূলক ছোট হলেও অপ্রয়োজনীয় বা যথাযথ যৌক্তিকতা ছাড়া কোনো খাতে অর্থ বরাদ্দ রাখা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ৮ লাখ টাকা সম্মানী কোন কোন কাজের জন্য বরাদ্দ, কারা পাবেন এই অর্থ এবং কীভাবে তা নির্ধারণ করা হবে, সেসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা দরকার। প্রকল্প অনুমোদনের আগে এসব ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত।’
মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘প্রকল্পে এয়ার কন্ডিশনার (এসি), জেনারেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার জন্য যে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা যদি বাজারদরের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে কেন বেশি হচ্ছে এবং সেই দামের যৌক্তিকতা কী, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ দেখলেই হবে না, প্রকৃত বাজারদর, প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রতিটি ব্যয় খাত যাচাই করা গেলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ও ঠেকানো সম্ভব।
এএইচ/এএইচ