মহিউদ্দিন রাব্বানি
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম
# বেতন বাড়লে বাড়বে বাজারের চাপ
# বাড়তি বেতনের সুফল কি মিলবে?
# রাজস্ব ঘাটতি, অর্থ জোগানই চ্যালেঞ্জ
# সরকারি বেতন বাড়লেও দুশ্চিন্তায় বেসরকারিরা
# বেতন বাড়ানোর সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি
প্রায় এক যুগের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে এক লাফে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি।
বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। তবে এই স্বস্তির বিপরীত পিঠে দেখা দিয়েছে অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ-সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি আয় বাজারে চাহিদা কতটা বাড়াবে, আর তার প্রভাবে পণ্য ও সেবার দামই বা কতটা বাড়বে?
কারণ নতুন বেতন কাঠামোর সরাসরি সুবিধা পাবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা এর বাইরে থাকছেন। তাদের আয় অনেক ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না।
ফলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার পর বাজারে যদি পণ্য ও সেবার দামও বেড়ে যায়, তাহলে একদিকে বেতন বৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে, অন্যদিকে আয়-বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন বেতন কাঠামোর সুফল ধরে রাখতে বাড়তি ব্যয়ের অর্থের জোগানের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। পাশাপাশি পেনশন ও বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে সরকার একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করছে না। আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা।
আয়ের সঙ্গে বাড়বে চাহিদাও
অর্থনীতির হিসাবে মানুষের হাতে টাকা বাড়লে ব্যয় বাড়ে। নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার ফলে খাদ্য, পোশাক, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন খাতে তাদের ব্যয় বাড়তে পারে।
এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ গেলে বাজারে কেনাকাটা বাড়ে, ব্যবসায়ীদের বিক্রি বাড়ে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে। সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা ফিরলে স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হওয়া এবং এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার কারণে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়ানো জরুরি। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ ও সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি দক্ষতা বাড়ে, তাহলে বাড়তি বেতনের সুফল অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে।
তবে সমস্যা দেখা দিতে পারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে। সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ এলেও বাজারে খাদ্যপণ্য, বাড়ি, পরিবহন, চিকিৎসা বা অন্যান্য সেবার সরবরাহ যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি সরাসরি বেতন বৃদ্ধি মানেই মূল্যস্ফীতি নয়। তবে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ তাল মেলাতে না পারলে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমানে খাদ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় এমনিতেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় বাজারে নতুন করে চাহিদা বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এ কারণেই সরকার যে ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নের পথে যাচ্ছে, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। একবারে বিপুল অর্থ বাজারে প্রবাহিত না হওয়ায় চাহিদার আকস্মিক চাপ কিছুটা কম থাকবে।
সরকারের ঘাড়েও পড়বে বড় ব্যয়ের বোঝা
নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন হলো এর অর্থের জোগান। নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ এর আওতায় আসবেন বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে উঠে এসেছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এই অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। আবার অন্য খাতের ব্যয় কমিয়ে বেতন-ভাতা মেটানো হলে উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক অর্থনৈতিক ড. এম মাসরুর রিয়াজ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিকে যৌক্তিক মনে করলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় দুর্বল এবং অর্থনীতিও এখন খুব শক্ত অবস্থানে নেই। ফলে এত বড় অতিরিক্ত ব্যয় সামলানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর কোথায়?
নতুন পে-স্কেলের পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা বেসরকারি খাত নিয়ে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট জাতীয় বেতন কাঠামো থাকলেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এমন কোনো একক কাঠামো নেই। প্রতিষ্ঠান ও খাতভেদে বেতন নির্ধারিত হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও অনেক কর্মীর বেতন একই হারে বাড়ে না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে কর্মরতদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি জানান, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর ৫ বা ৭ শতাংশ করে কর্মীদের বেতন বাড়ায়। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র নেই। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন যেখানে একসঙ্গে বড় হারে বাড়ছে, সেখানে বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় যদি সীমিত হারে বাড়ে বা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে আয়বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
শ্রমিকদের দাবি, আগে মজুরি বোর্ড
বেসরকারি খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলো অবশ্য বিষয়টি আরও সরাসরি দেখছে। তাদের দাবি, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো হলে শ্রমিকদের জন্যও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্র্নিধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন নতুন পে-স্কেলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের জন্যও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি।
তার দাবি, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং যেসব খাতে দীর্ঘদিন মজুরি পুনর্র্নিধারণ হয়নি, সেখানে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।
তার অভিযোগ, তৈরি পোশাক খাতে সর্বশেষ মজুরি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর মজুরি পুনর্র্নিধারণের কথা থাকলেও নতুন মজুরি বোর্ড এখনো গঠন হয়নি।
সাধারণ মানুষ কী পাবেন?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তারা বেশি পণ্য ও সেবা কিনবেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাজারে সেই বাড়তি চাহিদা মেটানোর মতো পণ্য না থাকলে দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
তার মতে, দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আয় বড় হারে বাড়লেও অন্য শ্রেণির আয় না বাড়লে শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও জনসেবার মান বাড়ানো যায়, তাহলে এই ব্যয়কে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগে পরিণত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পে-স্কেলের পর নজর বাজারে
অর্থের জোগান ও বাজারে পণ্য-সেবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারকে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। একদিকে বাড়তি বেতন ও পেনশনের অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।
কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনা কার্যকর ও শক্তিশালী করা না গেলে বাড়তি অর্থের একটি অংশ মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে আবারও মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আয় একই সময়ে না বাড়লে বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোর সুফল একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাবে না।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণেও তাই একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে শুধু বেতন বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নবম পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির নতুন অধ্যায় হলেও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি একই সঙ্গে একটি বড় পরীক্ষা। বাড়তি বেতন যদি বাড়তি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করতে পারে, তাহলে এর সুফল ছড়িয়ে পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। আর যদি বাজারের সরবরাহ না বাড়ে, রাজস্ব আয় দুর্বল থাকে এবং বেসরকারি খাতের আয় স্থবির হয়ে থাকে, তাহলে এই স্বস্তির বিপরীতে সাধারণ মানুষের কপালে জুটতে পারে বাড়তি বাজারদর।
নবম জাতীয় বেতন স্কেল প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমন্বয়কারী ফজলুল হাকিম লালা ঢাকা মেইলকে বলেন, অবিলম্বে সরকারকে শ্রমিকদের জন্যও একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে। বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা মজুরি শোষণের শিকার হচ্ছেন এবং প্রকৃত মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ফজলুল হাকিম লালা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং বাজার পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
তার মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। একইভাবে বাড়িওয়ালারা বাড়ি ভাড়া বাড়াতে পারেন এবং পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি আয় শেষ পর্যন্ত বাজারের বাড়তি দামে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বেতন বাড়ানোর ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু বাজারের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেই বাড়তি ক্রয়ক্ষমতার কোনো বাস্তব সুফল মানুষ পাবে না। তাই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে বিকল্পহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং সরকারও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি সমন্বয় করা প্রয়োজন ছিল।
তবে নতুন বেতন কাঠামোয় বৈষম্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুধু বেতন দিয়ে বিচার করলে হবে না। সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ বেতনের পাশাপাশি গাড়ি, জ্বালানি, চালকসহ বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এসব সুবিধার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতের বাইরে থাকা শ্রমজীবী মানুষের অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো জরুরি। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা থাকতে হবে। তা না হলে একদিকে শ্রমিক ও কর্মচারীদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে সেই বাড়তি আয় আবার বাজারেই চলে যাবে।
তার মতে, মজুরি বা বেতন বাড়লেই হবে না, বাজারকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাজারের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ না নিলে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে মানুষের যে বাড়তি ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হবে, তা বাজারের বাড়তি দামে চলে যাবে।
এমআর/জেবি