Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

বিনিয়োগ চাহিদা কম, ব্যাংকের বাড়তি টাকা যাচ্ছে বিল-বন্ডে

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

০৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১ এএম

# বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪.৪৭ শতাংশে
# বিনিয়োগ কমায় বাড়ছে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্য
# সরকারি বিল-বন্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ছে
# নিলামে কম সুদে দরপত্র, কমছে বিল-বন্ডের সুদহার
# ব্যাংক খাতে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তহবিল

দেশে বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। ঋণ বিতরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় আয় বাড়াতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। 

উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে সরকারি সিকিউরিটিজের নিলামে অংশ নিতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। এর প্রভাবে কমছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার। একইসঙ্গে সময়মতো অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সরকারি এসব সিকিউরিটিজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

এর মধ্যে ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়াতে প্রধান নীতি সুদহার রেপোর হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২ আগস্ট থেকে নতুন এ সুদহার কার্যকর হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার কমানোর পর সরকারি বিল-বন্ডের সুদহার আরও দ্রুত কমছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে শুধু উচ্চ সুদহার দায়ী নয়। বরং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যবসার পরিবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতিই বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিদ্যমান শিল্পকারখানার উৎপাদন চালু রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তারা। এমনকি কম সুদের ঋণ দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগেও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তাতেও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকঋণের গড় সুদহার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করলে প্রকৃত সুদহারও নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। এরপরও ঋণের চাহিদা বাড়ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। অনেক ব্যাংক এখন মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটিতে (এসডিএফ) টাকা রাখছে। পাশাপাশি সরকারি বিল-বন্ডের নিলামে কম সুদে দরপত্র দাখিল করছে। ফলে এসব সিকিউরিটিজের সুদহারও কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঋণের সুদহার কমানোর উদ্দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো নীতি সুদহার কমিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সমস্যা সমাধান না করে শুধু সুদহার কমিয়ে ঋণের চাহিদা বাড়ানো সম্ভব নয়। বরং এর ফলে আমানতের সুদহার আরও কমে যেতে পারে। এমনিতেই ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে না পারায় ঋণের সুদহার কমাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সুদহার কমানো ছাড়া ব্যাংকের সামনে তেমন কোনো বিকল্পও নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের নিলামে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এ অর্থের জন্য সুদ দিতে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। 

এর আগে গত ৮ জুলাই একই মেয়াদের বন্ডে চার হাজার কোটি টাকা তোলা হয়েছিল ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ সুদে। গত জুনে দুই বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর গত বছরের জুনে এ সুদহার ছিল ১২ দশমিক ২০ শতাংশ।

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার প্রায় ২ দশমিক ৮১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। শুধু গত জুনের তুলনায়ও সর্বশেষ নিলামে সুদহার কমেছে প্রায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট।

তিন বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ নিলামে সরকার ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর আগে গত ৮ জুলাই এ মেয়াদের বন্ডের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। গত জুনে ছিল ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর গত বছরের জুনে তিন বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ছিল ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ।

সরকারি বন্ডের পাশাপাশি ট্রেজারি বিলের সুদহারও দ্রুত কমছে। গত ৩ আগস্ট ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার তিন হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এ ক্ষেত্রে সুদহার নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। একই দিনে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে আড়াই হাজার কোটি টাকা এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে দুই হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। উভয় মেয়াদের বিলে সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

এর আগে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ, কয়েক দিনের ব্যবধানেই বিলগুলোর সুদহার আরও কমেছে।

গত বছরের জুনের সঙ্গে তুলনা করলে পতনের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। ওই সময়ে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ১২ দশমিক ০১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বল্পমেয়াদি সরকারি বিলের সুদহারও প্রায় আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কম সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় এসব উদ্যোগে প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি থাকায় ব্যাংকগুলোও যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন ঋণ দিতে সতর্কতা অবলম্বন করছে।

তিনি বলেন, ঋণ বিতরণের সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলো এখন উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। ফলে নিলামে অংশ নেওয়ার সময় অনেক ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে দরপত্র দাখিল করছে। এতে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদহারও ধীরে ধীরে কমে আসছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ফলে মানুষ এখন শুধু আমানতের সুদহার দেখছে না; প্রয়োজনের সময় অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি বিল-বন্ডের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

একসময় সাধারণ মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সঞ্চয়পত্র। এখন সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি সরকারি বিল-বন্ডেও আগ্রহ বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর হাতেও বিনিয়োগযোগ্য বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে। 

ফলে ব্যাংক ও সাধারণ বিনিয়োগকারী—দুই দিক থেকেই সরকারি সিকিউরিটিজের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে নীতি সুদহার কমানোর প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারে নিম্নমুখী চাপ আরও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু নীতি সুদহার কমিয়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করা কঠিন। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা, ব্যবসার পরিবেশ এবং আস্থার সংকটসহ অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলোতে উন্নতি আনতে হবে। তা না হলে ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়লেও তা উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে সরকারি বিল-বন্ড কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সুবিধায় পড়ে থাকার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশে বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র সরকারকে প্রকাশ করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘উদ্বৃত্ত তারল্য মূলত ব্যাংকিং খাতে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ ব্যাংকের অর্থ যদি ব্যবসা ও উৎপাদন খাতে না গিয়ে সরকারি ঋণে চলে যায়, তাহলে অর্থনীতির বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।’

টিএই/এএইচ