শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি, বেড়েই চলছে বাণিজ্য ঘাটতি

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ এএম

শেয়ার করুন:

রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি, বেড়েই চলছে বাণিজ্য ঘাটতি

আমদানি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না রফতানি আয়। ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণেই বাণিজ্য ঘাটতির চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) প্রতিবেদন এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে দেশে মোট পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের। একই সময়ে রফতানি হয়েছে ৪০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে ১১ মাসে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৪ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার, বা প্রায় ২৪ শতাংশ। শুধু এপ্রিল থেকে মে মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এপ্রিল শেষে যেখানে ঘাটতি ছিল ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার, মে শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি কমে ২০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ঘাটতি ছিল ২২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রফতানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সরকার এ অর্থবছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও প্রকৃত আয় সেই লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রফতানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ওই মাসে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু বছরের প্রথম ১১ মাসের দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে জুনের এমন ইতিবাচক ধারা সামগ্রিক ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রফতানি হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘ সময় ধরেই রফতানি খাত চাপের মুখে ছিল।

দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকে জুন মাসে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।

তবে বিকেএমইএর সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, জুনের এই প্রবৃদ্ধি প্রকৃত অর্থে বাজার সম্প্রসারণের ফল নয়। তার ভাষ্য, ঈদুল আজহার ছুটির সময়ের পার্থক্যের কারণে এ বছর জুনে কারখানাগুলো ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কর্মদিবস পেয়েছে। ফলে উৎপাদন ও রফতানি বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হয়নি।

শামীম এহসান বলেন, ‘পুরো অর্থবছরে নিটওয়্যার রফতানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে শ্রমিকের মজুরি, সুতা, রং-রাসায়নিক ও জ্বালানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু ক্রেতারা সে অনুযায়ী দাম বাড়াচ্ছেন না। ফলে অনেক কারখানা লোকসানে চলছে, কেউ কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, আবার অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার অবস্থায় রয়েছে।’

তবে পোশাক খাতের বাইরে কয়েকটি রফতানি খাতে অবশ্য ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুন মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৫৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ৪৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং কৃষিপণ্যে ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

রফতানি বাজারেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি। জার্মানি ও যুক্তরাজ্য যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে রয়েছে। জুন মাসে বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রফতানি গন্তব্যেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইপিবি।

অন্যদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের কয়েকটি সূচকে উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ৩০ কোটি ১০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে, যা এপ্রিল শেষে ছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

আর্থিক হিসাবেও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে ব্যালান্স অব পেমেন্টের সামগ্রিক ভারসাম্যেও প্রায় ৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুন মাসের রফতানি প্রবৃদ্ধি নতুন অর্থবছরের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও আমদানি ও রফতানির ব্যবধান কমাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বাজার বহুমুখীকরণ এবং রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তা না হলে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আগামী দিনেও অব্যাহত থাকতে পারে।

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের দেশের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম কারণ অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট। বিশেষত আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ এই সঙ্কটকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম বা পদক্ষেপ লক্ষ্যণীয় হয়নি। কাজেই সামনের দিনগুলোতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এজন্য সরকারকে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং বিপরীতে রফতানি আয়ের নতুন নতুন উৎস বের করতে হবে।

টিএই/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর