Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

রাসায়নিক আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে কার্যকর রোডম্যাপের আহ্বান ব্যবসায়ীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

দেশের রাসায়নিক শিল্প খাতের বাজার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হলেও অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতা, উচ্চ শুল্ক, জটিল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকট এবং দুর্বল লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে সম্ভাবনাময় এই শিল্পে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ফলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধসহ রফতানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় রাসায়নিক নির্ভর শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করতে সময়োপযোগী নীতিসহায়তা ও একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা।

শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রফতানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেকাংশেই প্রতিযোগিতামূলক রাসায়নিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিল্পে ব্যবহৃত রঙ, রাসায়নিক ও বিশেষায়িত কাঁচামালের অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, শুল্ক জটিলতা, পরিবেশগত অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটি কৌশলগত প্রয়োজন।

বিআইএমের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, শিল্পনীতি সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান শিল্পনীতিতে নতুন অধ্যায় যুক্ত করলেই হবে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তারা মতামত দিলে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিসিএসআইআরের সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান বলেন, শিল্প ও শিক্ষা খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পণ্য শিল্পে ব্যবহারের মাধ্যমে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

তিনি জানান, হালকা প্রকৌশল শিল্পের বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হলেও এর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং কার্যকর নীতিসহায়তা জরুরি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসআর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। তিনি বলেন, দেশের রাসায়নিক খাতের বাজার ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এবং এটি বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক আমদানি করেছে, যার বড় অংশ তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে উচ্চ শুল্ক, দুর্বল অবকাঠামো, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বক্তারা বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রাসায়নিক খাতেও দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন, বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং সহজে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে হবে।

এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব সুরাইয়া সুলতানা জানান, স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকার ধাপে ধাপে শুল্কহার কমাচ্ছে। এ ছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স পুরোপুরি অনলাইনে দেওয়া শুরু হয়েছে, যার সুফল শিগগিরই উদ্যোক্তারা পাবেন।

পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, শিল্পে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

আলোচনা সভায় পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম মোসাদ্দেক হোসেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ইয়াসমিন নাহার জলি, বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রফতানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা, বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ, বিকেএমইএর পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এবং ডাইস্টার সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মো. মাজাহারুল ইসলাম সুমন বক্তব্য দেন।

সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আলহাজ আব্দুস সালাম এবং ডিসিসিআই সদস্য এম এস সিদ্দিকী অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


এমআর/এফএ