এবারের জাতীয় বাজেটে কর হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ, বাজার তদারকি জোরদার এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর নানা ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আশা ছিল, অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কিছুটা হলেও দাম কমবে। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পরও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে মুদি দোকান, মাছের আড়ত থেকে চালের গুদাম-সবখানেই উচ্চ দামের চাপ অব্যাহত রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, সবজি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও মসলাসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মূল্যস্ফীতি আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় দিন দিন কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ফলে সংসারের ব্যয় সামাল দিতে অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে সঞ্চয় ভাঙতে, প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে এলেও তা টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় যে গতিতে বাড়ছে, তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটিই প্রকৃত আয়ের সংকোচন, যার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর।
কর কমেছে, কমেনি বাজার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার চাল, ডাল, গম, আটা, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, লবণ ও বিভিন্ন মসলাসহ ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে অভিন্ন শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি আমদানিপণ্যের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা ছিল, এতে আমদানি ব্যয় কমবে এবং তার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়বে।
কিন্তু শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল, কৃষি মার্কেট, ঝিগাতলা, ডেমরা ও স্টাফ কোয়ার্টার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কর কমার সেই সুফল এখনো ভোক্তার হাতে পৌঁছায়নি। বরং অনেক পণ্যের দাম আগের চেয়েও বেড়েছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, বাজেটের পর আশা করেছিলাম অন্তত চালের দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি উল্টো চিত্র।
চাল-ডাল থেকে মসলা, সবখানেই চাপ
বর্তমানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, কালিজিরা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোলাও চাল ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও ১৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া পোলাও চাল এখন ২০০ টাকায় পৌঁছেছে।
ছোট মশুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, মুগডাল ১৩০ থেকে ১৭০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ১৯৯ টাকা, দুই লিটারের বোতল ৩৯৮ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মসলার বাজারেও নেই স্বস্তি। জিরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, লবঙ্গ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ছোট এলাচ ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডেমরার গৃহিণী রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘আগে রান্নায় যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার করতাম, এখন অনেক কিছুই কমিয়ে দিতে হচ্ছে। বাজারে গেলেই মনে হয় নতুন করে দাম বেড়েছে।’
সবজির বাজারে বর্ষার প্রভাব
টানা মৌসুমি বৃষ্টি ও বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে সবজির বাজারেও। রাজধানীর অধিকাংশ কাঁচাবাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম এখন ৮০ টাকার ওপরে। বেগুন, করলা, শসা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স ও বরবটি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু বাজারে বেগুন, গাজর ও করলার দাম ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নাঈম হাসান বলেন, যে বাজার একসময় ৫০০ টাকায় করা যেত, এখন সেই বাজার করতে ১ হাজার টাকারও বেশি লাগে।
হাসানুজ্জামান হক বলেন, বর্ষা এলেই সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। কিন্তু দাম কমার সময় আর আসে না। বাজারে নিয়মিত তদারকি থাকলে এমন হতো না।
মাছে নতুন চাপ, মাংসে স্থিতি
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও দেখা দিয়েছে নতুন অস্থিরতা। রুই ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, কাতলা ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, ইলিশ ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাঙ্গাশ ২২০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব ধরনের মাছই কেজিতে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
অন্যদিকে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা, খাসি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা, ব্রয়লার ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাংসের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও মাছের ঊর্ধ্বমুখী দাম নতুন করে ভোক্তাদের চাপে ফেলেছে।
ডেমরার মাছ বিক্রেতা রায়হান মিয়া বলেন, পাইকারি বাজারেই মাছের দাম বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি, ভোক্তাদের প্রশ্ন
ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন করহারে আমদানি করা পণ্য এখনো পুরোপুরি বাজারে আসেনি। পাশাপাশি টানা বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী মুজিব হক বলেন, অনেক সবজি পরিবহনের সময় নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই দাম বাড়ে।
তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের মতে, কর বা শুল্ক বাড়ার ঘোষণা এলেই বাজারে সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ে। কিন্তু কর কমার পর সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে এত সময় লাগে কেন?
বিশেষজ্ঞদের চোখে সমস্যার মূল কারণ
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকার বাজেটে ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্কহার কমিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর ছিল। কিন্তু শুল্ক কমানোর পরও বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তাই কর-সুবিধার অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কেন এর সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না, তা সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।
তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকার একদিকে শুল্ক কমিয়ে রাজস্ব ছাড় দিচ্ছে, অন্যদিকে সেই সুবিধা সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তাহলে এই অর্থ কারা পাচ্ছে, সেটি তদন্তের বিষয়। যদি ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে এই সুবিধা নিজেদের কাছে রেখে দেন, তাহলে সরকারের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়।
এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ বন্যা দেশের সব এলাকায় হয়নি। নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় প্রভাব থাকলেও প্রায় সারা দেশেই একইভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই প্রতিফলন।
তার মতে, বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আগের তুলনায় কমে গেছে। এ কারণে বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণও নেই।
নাজের হোসাইন বলেন, সরকার চাইলে টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণ এবং বাজার তদারকিকে অগ্রাধিকার দিলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে।
ক্যাবের এই নেতা বলেন, সরকার যে ৬৩টি পণ্যে শুল্ক কমিয়েছে, সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার তদন্ত করে দেখতে হবে, কোথায় এই সুবিধা আটকে যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণই নয়, কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকেও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মসংস্থান না বাড়লে মানুষের আয় বাড়বে না, আর আয় না বাড়লে ক্রয়ক্ষমতা কমতেই থাকবে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না। তাই বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যকর উদ্যোগও সময়ের দাবি।
এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কর কমানো বা মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ অর্থনীতির বড় সূচক যতই ইতিবাচক বার্তা দিক, সাধারণ মানুষের কাছে তার মূল্য তখনই থাকবে, যখন বাজারে গিয়ে তারা স্বস্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ঘরে ফিরতে পারবেন। এখন সেই স্বস্তির অপেক্ষাতেই রয়েছে দেশের কোটি কোটি মানুষ।
এমআর/জেবি




