মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩০ এএম
# মে মাসে কার্ডে মোট লেনদেন ৪,২৮৮ কোটি টাকা
# এক মাসে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১০.৮৫ শতাংশ
# বছরওয়ারি ক্রেডিট কার্ড ব্যয় বেড়েছে ৩৩.১৫ শতাংশ
# বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে
# ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই হয়েছে মোট লেনদেনের প্রায় অর্ধেক
# আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যয়ের শীর্ষ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র
দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপণ্যের ব্যয় সামাল দিতে ক্রমেই ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন ভোক্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবার এখন নগদের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছে, যা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় যা ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। এপ্রিল মাসে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।
বছরওয়ারি হিসাবেও প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। গত বছরের মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড ব্যয় বেড়েছে ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মে মাসজুড়ে কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ভোক্তাদের আস্থা শক্তিশালী ছিল। দেশীয় খুচরা বাজারের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে।
একইসঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া অর্থের পরিমাণও ইঙ্গিত দিচ্ছে, পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে অনেকেই এখনো ঋণনির্ভর ভোগব্যয়ের পথ বেছে নিচ্ছেন।
মে মাসে দেশের মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এতে বোঝা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও খুচরা কেনাকাটায় কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ক্যাশব্যাক ও ডিসকাউন্ট অফার, কার্ড ব্যবহারের সুবিধা এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ড গ্রহণের হার বেশি হওয়ায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দেশের বাইরে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ও কিছুটা বেড়েছে। মে মাসে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা, যা এপ্রিলের ৪২৪ কোটি টাকার তুলনায় ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকের ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে ব্যয় কমেছে। মে মাসে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩১২ কোটি টাকা, যা এপ্রিলের ৩২৯ কোটি টাকা থেকে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ কম।
তবে বছরওয়ারি হিসাবে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে কার্ড ব্যয় ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে, যা পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশের ক্রেডিট কার্ডের মোট অনুমোদিত ঋণসীমা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১ কোটি টাকা। এর মধ্যে কার্ডধারীদের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ ১৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, অনেক গ্রাহক তাৎক্ষণিক ব্যয় নির্বাহে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছেন।
বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয়ের গন্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে। দেশটিতে মোট আন্তর্জাতিক কার্ড লেনদেনের ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যার অংশ ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
এরপর রয়েছে থাইল্যান্ড (৮.৮৫ শতাংশ), সিঙ্গাপুর (৭.৮১ শতাংশ), সৌদি আরব (৭.৪৭ শতাংশ), ভারত (৬.৮৯ শতাংশ), মালয়েশিয়া (৫.০৮ শতাংশ), নেদারল্যান্ডস (৪.৮৯ শতাংশ), চীন (৪.৭৮ শতাংশ), কানাডা (৪.০৩ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৩.৯৩ শতাংশ) এবং আয়ারল্যান্ড (৩.৫১ শতাংশ)।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যয়ের অংশ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মে মাস শেষে দেশের ক্রেডিট কার্ডের মোট অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ৪২ হাজার ১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে কার্ডধারীদের কাছে বকেয়া বা আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, অনেক গ্রাহক এখনো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের ওপর নির্ভর করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সাধারণ (পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট) মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ।
পাশাপাশি খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দামই বেড়েছে।
আরও পড়ুন: জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বাড়ছে ভোক্তা ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষকে সাময়িকভাবে ক্রেডিট কার্ডনির্ভর করে তুলছে। তবে আয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের ভোগব্যয় টিকিয়ে রাখতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে বকেয়া ঋণও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সচেতনতা এবং ঋণ পরিশোধে সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
টিএই/এএইচ