৫০০ টাকার একটি নোট নিয়ে রাজধানীর মালিবাগ বাজারে সবজি কিনতে যান আরাফাত। বিল পরিশোধের সময় দেখেন নোটটির একটি অংশ স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো। সেটি দেখার পর দোকানদার নোটটি নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর কয়েকটি দোকানে চেষ্টা করেও নোটটি চালাতে না পেরে আরাফাত বাধ্য হয়ে পাশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় যান। সেখানেও টাকা বদলে দিতে গরিমসি করা হয়। উপায় না পেয়ে আরও কয়েকটি শাখা ঘোরার পর অবশেষে নোটটি বদলাতে সক্ষম হন তিনি।
শুধু আরাফাতই নন, ছেঁড়া, ময়লা ও জীর্ণশীর্ণ নোট নিয়ে প্রতিদিনই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মানুষ। বাজার ছাড়াও গণপরিবহন, হাসপাতাল, দোকানপাট-প্রায় সব ধরনের নগদ লেনদেনেই ছেঁড়া, স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো কিংবা অতিরিক্ত ব্যবহারে রং মুছে যাওয়া নোট নিয়ে তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
রাজধানীসহ সারা দেশের বাজারে এখন ছেঁড়া ও ময়লা নোটের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। বহুল ব্যবহৃত এসব নোটের বড় একটি অংশই এখন ছেঁড়াফাটা এবং অতিমাত্রায় ময়লাযুক্ত। এসব নোটকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই ক্রেতা, বিক্রেতা, পরিবহনকর্মীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ছেঁড়া ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ করে সমমূল্যের নোট দিয়ে বিনিময় করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ব্যাংক সেই নির্দেশনা কার্যকর করতে গড়িমসি করছে। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।
জানা গেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন নোটের নকশা জটিলতা, নোট ছাপাতে কাঁচামাল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নতুন নোটের সংকট তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর-মতিঝিল রুটে চলাচল করা একটি বাসের কন্ডাক্টর জানান, যাত্রীরা প্রায়ই ছেঁড়া নোট ভাড়া হিসেবে দেন। তবে একই নোট ভাঙতি হিসেবে ফেরত দিলে তা নিতে চান না অনেকেই। আবার দিন শেষে বাস মালিকও এসব নোট নিতে চান না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাইরে থেকে নোট বদলাতে হয়।
রাজধানীর একটি হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারে কর্মরত হোসেন বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের কথা বিবেচনা করে অনেক সময় ছেঁড়া নোট নেওয়া হয়। কিন্তু পরে ব্যাংকে গিয়ে এক দিনে সেগুলো বদলানো সম্ভব হয় না। এতে সময় ও শ্রম-দুটিই নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। দেশজুড়ে ছেঁড়া, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সব তফসিলি ব্যাংককে এসব নোট গ্রহণ করে সমমূল্যের নোট বিনিময় বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি এ নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জনসাধারণের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু নগদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাংকের সব শাখায় বিধি অনুযায়ী ছেঁড়াফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার পরিবর্তে নতুন বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট দেওয়ার সেবা নিয়মিতভাবে চালু রাখতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাজারে এমন নোটের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা নগদ লেনদেনে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ক্লিন নোট পলিসি’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় বিশেষ করে ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার ছোট মূল্যমানের নোট নিয়মিত গ্রহণ করে নির্ধারিত কাউন্টারের মাধ্যমে তা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব নোটের পরিবর্তে গ্রাহকদের নতুন বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট সরবরাহ করতে হবে।
এ সেবা দিতে কোনো ব্যাংকের শাখার অনীহা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে অনেক ব্যাংকের শাখায় ছেঁড়া ও জীর্ণ নোট পরিবর্তনে অনীহা দেখা গেছে।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা রাফি বলেন, ‘আমি এক হাজার টাকার নোট নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের সোহরাওয়ার্দী শাখায় যাই। টাকাটিতে আড়াআড়িভাবে স্কচটেপ ছিল। ক্যাশ কাউন্টারে গেলে কর্মকর্তা নোটটি বদলে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ম্যানেজারের কাছে গেলে তিনি প্রথমে সাবধানে স্কচটেপটি তুলে ফেলতে বলেন। স্কচটেপ তোলার পর তিনি দাবি করেন টাকার মান খারাপ হয়ে গেছে। এটি বদলে দেওয়া সম্ভব না।’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মকবুল আহমেদ জানান, “কিছুটা ছেঁড়া ৫০০ টাকার একটি নোট বদল করতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে যাই। ব্যাংকের কাউন্টারে লেখা ‘এই শাখায় ছেড়াফাঁটা নোট বদল করা হয়।’ শাখার ইনচার্জ আমার টাকাটি নেয়নি। তারপর রিং রোডের আরেকটি শাখায় গেলে টাকাটি আমাকে বদলে দেয়।"
আরও পড়ুন: জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বাড়ছে ভোক্তা ঋণ
এভাবে ছেঁড়াফাটা টাকা বদলাতে ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষকে। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমন টাকা পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নিচতলার কাউন্টার সেবা বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নোট পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন না। এমনকি গত দুই ঈদেও সেখানে নতুন নোট বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতা ও নতুন নোটের সংকটকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশেই ছেঁড়া নোট বদলের নির্দিষ্ট কাউন্টারে প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড় দেখা যায়। গুলিস্তান, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকাতেও সক্রিয় রয়েছে এসব চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, ১০০ টাকার জীর্ণ নোটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকা। অর্থাৎ, গরিব ও অসহায় মানুষের কষ্টার্জিত টাকা থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। নোটের অবস্থা বেশি খারাপ হলে তা নামমাত্র মূল্যে সংগ্রহ করছে চক্রগুলো।
আবার ঈদের সময় সাধারণ মানুষ নতুন নোট না পেলেও অতিরিক্ত মূল্যে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় নতুন টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাকের ডগায় অহরহ এমন কাজ চললেও যেন দেখার কেউ নেই।
পুরোনো নোট বদলের ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন বলেন, ‘এখন নতুন নোট বাজারে না থাকায় পুরোনো নোট বেড়েছে। অনেক ছেঁড়াফাটা ও পুরোনো নোট যেগুলো আছে সেটা আমরা বিনিময় করে দেই। নোটের অবস্থা বুঝে আমরা দাম নিয়ে থাকি। আগে এ ধরনের নোট কম এলেও এখন বেশি আসছে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে টাকা ছাপাতে পারে না। এখানে অনেকগুলো প্রক্রিয়া থাকে। নতুন নোট বাজারে ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টাকা ছাপাতে কাঁচামালের কিছু স্বল্পতা রয়েছে। সব কিছুই প্রসেসের মধ্যে রয়েছে। আর আমাদের সকল ব্যাংককে নোট পরিবর্তনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এক্ষেত্রে কোনো গ্রাহক যদি ভোগান্তির শিকার হন তবে তা আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেন। আমরা ব্যবস্থা নেব।’
টাকার এমন জীর্ণ অবস্থার জন্য ব্যাংকগুলোর দায়ও কম নয়। নোটে পিন মারা, লেখা বা সেলাই না করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও অনেক ব্যাংক শাখাতেই তা মানা হচ্ছে না।
এখনো বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকার বান্ডিলে বড় স্ট্যাপলার দিয়ে পিন মারা, লাল কালি দিয়ে নোটে লেখা এবং প্রয়োজনে সেলাই করার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এতে নোটের কাগজ দুর্বল হয়ে যায়, কমে যায় স্থায়িত্ব। ফলে দ্রুত ছিঁড়ে ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে টাকা।
খুচরা টাকার ঘাটতিতে লেনদেনে নতুন সংকট
এদিকে খুচরা টাকার সংকটে দৈনন্দিন লেনদেনে তৈরি হয়েছে নতুন ভোগান্তি। বিভিন্ন দোকানে ১-২ টাকার চকলেটকে এখন বিনিময় পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পণ্য কেনার পর কেউ ১-২ টাকা ফেরত পেলে খুচরা টাকা না থাকায় তার পরিবর্তে ১-২ টাকার চকলেট দেওয়া হয়। যদিও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ১ টাকার চকলেটও এখন তেমন পাওয়া যায় না। আবার খুচরো টাকা না থাকার অজুহাতে পাঁচ টাকার কয়েন বা নোট দিতেও অপারগতা দেখায় দোকানদাররা। ফলে ১, ২, ৫ টাকার পণ্য মিলিয়ে দিয়ে গ্রাহককে বিদায় করছেন তারা।
ক্যাশলেস লেনদেনে বাধা ১ শতাংশ চার্জ
এদিকে কাগুজে নোটের ব্যবহার কমাতে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’। শপিংমল, রেস্তোরাঁ, ওষুধের দোকান কিংবা ফুটপাতের ছোট ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই বিল পরিশোধ করা যাবে।
শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (এমএফএস) গ্রাহক নয়, দেশের যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক একই কিউআর কোড ব্যবহার করে লেনদেন করতে পারবেন। কিন্তু অ্যাপভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তির অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলা কিউআর’ পরিশোধে মার্চেন্ট থেকে ১ শতাংশ বাড়তি চার্জ কাটা হচ্ছে। বাড়তি খরচ আরোপ করায় ক্যাশলেস লেনদেন জনপ্রিয় করার এ প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
গত ১ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সম্পর্কিত নির্দেশনার পর সামাজিক মাধ্যম, ব্যাংকার, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। নতুন এই চার্জ আরোপের কারণে বাংলা কিউআরে পরিশোধ নিরুৎসাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
টিএই/এমআর




