মহিউদ্দিন রাব্বানি
১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৫ এএম
# এলডিসি উত্তরণে টেক্সটাইল খাতে বাড়ছে চাপ
# সুতা আমদানি বৃদ্ধিতে চাপে দেশীয় স্পিনিং মিল
# প্রাইমারি টেক্সটাইলে বিনিয়োগ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার
# স্থানীয় কাঁচামালই পোশাক খাতের বড় শক্তি
# এলডিসি-পরবর্তী শর্ত পূরণে টেক্সটাইল খাত গুরুত্বপূর্ণ
# শিল্প সুরক্ষায় সরকারের কাছে বিটিএমএর ছয় দাবি
# উত্তরণ প্রস্তুতিতে আরও তিন বছর সময় চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত। স্থানীয়ভাবে সুতা, কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করে এই খাত শুধু রফতানি শিল্পকে গতিশীল করেনি, একইসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্প ক্রমেই আমদানি-নির্ভর হয়ে উঠবে, বাড়বে উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে সম্প্রতি ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছে। সংগঠনটির মতে, এলডিসি-উত্তর সময়ে রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এসব দাবি বাস্তবায়ন জরুরি।
অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি
বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির আওতায় বর্তমানে ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্যপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পিনিং, উইভিং, ডেনিম, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংসহ বস্ত্রশিল্পের বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত। শুধু প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতেই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পুরো টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল ভ্যালু চেইনে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারে।
দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। জাতীয় জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। সরাসরি প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে টেক্সটাইল, পোশাক, হোম টেক্সটাইল, প্যাকেজিং ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে। পরোক্ষভাবে প্রায় চার কোটি মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এ খাতের যেকোনো সংকট জাতীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাড়ছে সুতা আমদানি, চাপে দেশীয় মিল
দেশে তুলা উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করে সুতা উৎপাদন করতে হয়। তারপরও দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো নিট পোশাক শিল্পের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন পোশাক শিল্পের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করে আসছে।
এছাড়া স্থানীয়ভাবে সুতা উৎপাদনের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় শিল্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
বিটিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ১৪২ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি আরও বেড়ে ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশেষ করে ভারত থেকে সুতা আমদানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার অভিযোগ তুলছেন। তাদের মতে, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের কারণে স্থানীয় শিল্প এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি-নির্ভরতা বাড়লে অনেক মিল উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এলডিসি-উত্তর প্রস্তুতি
২০২৯ সালের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা হারাবে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা অব্যাহত রাখতে হলে কঠোর রুলস অব অরিজিন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব শর্ত পূরণে দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় উৎপাদন না হলে তৈরি পোশাক শিল্পের মূল্য সংযোজন কমে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে।
একজন শিল্প বিশ্লেষকের ভাষায়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ। যদি স্পিনিং ও টেক্সটাইল খাত দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে রফতানিকারকদের কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে উৎপাদন সময় বাড়বে এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
বিটিএমএর ছয় দফা দাবি
এই বাস্তবতায় বিটিএমএ সরকারের কাছে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সহায়তা চেয়েছে।
প্রথমত, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রত্যাহার করা ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় সুতা ব্যবহারকারী রফতানিকারকদের জন্য বিদ্যমান ১ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ সহায়তা বাড়িয়ে কমপক্ষে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের করপোরেট আয়কর হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চতুর্থত, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার, পিভিসি রেজিন এবং পিইটি রেজিনের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করা হয়েছে।
পঞ্চমত, নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার অথবা বিদ্যমান ৫ শতাংশ উৎসে করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠত, আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের ওপর আরোপিত নোটিশনাল সুদ সংক্রান্ত বিধান থেকে রফতানিমুখী শিল্পকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সামনে কী ঝুঁকি?
বিটিএমএ’র মতে, দেশীয় স্পিনিং ও প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো পোশাক শিল্প আমদানিকৃত সুতা ও কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে যাবে। এতে লিড টাইম বৃদ্ধি পাবে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ সংকুচিত হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, অর্থাৎ দ্রুত কাঁচামাল সরবরাহ ও দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ টেক্সটাইল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ ও বিনিয়োগ রয়েছে, যা শিল্পের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন হলেও এর অর্থ নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় প্রবেশ করা। সেই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে শুধু পোশাক শিল্প নয়, এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করা টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্পকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, কর ও শুল্ক সহায়তা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং স্থানীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধির কৌশল। অন্যথায় এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখা মানেই শুধু একটি শিল্পকে বাঁচানো নয়; বরং দেশের রফতানি অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী রাখা। তাই এলডিসি-উত্তর যুগে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এখনই কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘দেশের শিল্প খাত বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফলে শিল্পের বিকাশ ও নতুন বিনিয়োগ উভয়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।’
এলডিসি উত্তরণে আরও ৩ বছর সময় চাইল বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুষ্ঠু উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এই অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
এ সময় তিনি এলডিসি দেশগুলোর জন্য অনুকূল অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। জাতিসংঘও বাংলাদেশের উন্নয়ন ও উত্তরণ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের মানদণ্ডের ভিত্তিতে সময় বাড়ানোর সুযোগ না থাকলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে।
তার মতে, টেকসই উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে অগ্রগতি কম হওয়ায় অতিরিক্ত সময়ের আবেদন যৌক্তিক। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে হবে, তাই বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করতে এখন থেকেই কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, ২০২৪ সালেই উত্তরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ায় এ আবেদন খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে। তার ভাষ্য, ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়েই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।
এমআর/এএইচ