- সরকারি গুদামে প্রায় ১৮ লাখ টন চালের মজুত
- বাম্পার ফলনেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক
- ধান থেকে চাল হতে হতে প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে দাম
- এক মাসেই বেড়েছে মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দাম
- নজরদারি বাড়ানোর কথা বলছে সরকার
সরকারি গুদামে প্রায় ১৮ লাখ টন চালের মজুত রয়েছে। চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। চাল আমদানিতেও রয়েছে শুল্ক-কর ছাড়। এরপরও বাজারে চালের দাম কমছে না। বরং ধান ও চালের দামের ব্যবধান আরও বেড়েছে। কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন, অথচ মিল থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দাম বাড়তে বাড়তে চাল পৌঁছাচ্ছে ভোক্তার কাছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে একটি প্রভাবশালী মিলার চক্রের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে কম দামে কৃষকের গোলা থেকে বের হওয়া ধান বাজারে চাল হয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
আরও পড়ুন: সবজিতে স্বস্তি, ডিম-মুরগির বাজার চড়া
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে ২২ লাখ ৫২ হাজার টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ টন চাল, ৩ লাখ ৩১ হাজার টন ধান এবং প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন গম রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও সরকারি মজুত থাকার পরও চালের বাজারে এমন মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার চিত্র নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকেরা ভালো ফলন পেয়েছেন। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছায়নি। কারণ, ফসল ঘরে তোলার সময়ই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়। জমির ভাড়া, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন ব্যয় যোগ করলে খরচ আরও বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ধানের ন্যায্য দাম পাই না। কিন্তু সেই ধান থেকেই তৈরি চাল বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। কৃষক কষ্ট করে উৎপাদন করেন, আর লাভের বড় অংশ চলে যায় অন্যদের হাতে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী লতিফের রহমান বলেন, গত এক মাসে মিলপর্যায়েই বিভিন্ন ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে মিনিকেট, নাজিরশাইল ও পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: মাছের বাজারে স্বস্তির হাওয়া
তিনি বলেন, আমরা বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। মিল থেকে দাম না বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ত না।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি পর্যন্ত। এক মাসের ব্যবধানে কিছু কিছু চালের বস্তাপ্রতি দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা নয়ন হোসেন বলেন, ধানের ফলন ভালো, সরকারের মজুতও পর্যাপ্ত। তারপরও চালের দাম কমছে না। বাজারে গেলে মনে হয়, কেউ না কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে রেখেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের।
সাভারের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী শাহানা বেগম বলেন, একটি পরিবারের মাসিক খরচের বড় অংশই এখন চাল কিনতে চলে যাচ্ছে। চালের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। অন্য নিত্যপণ্যের দামও বেশি। সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, চাল আমদানির এলসি সীমিত থাকায় বড় মিল মালিকরা বাজারে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন। প্রয়োজন হলে সরকারকে আরও বেশি আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানিও অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের খাদ্য মজুত স্বাভাবিক রাখতে সরকার অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আমদানি কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: দুই দফা কমার পর ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চালের বাজারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মিল, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অভিযান বা বাজার তদারকি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বড় মিল মালিকদের বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তাদের মতে, কৃষক যদি উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য না পান এবং ভোক্তা যদি চড়া দামে চাল কিনতে বাধ্য হন, তাহলে মাঝখানে কোথাও না কোথাও বাজার বিকৃত হচ্ছে। সেই বিকৃতি দূর করতে না পারলে সরকারি মজুত, বাম্পার ফলন কিংবা শুল্ক-কর ছাড়ের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। বরং চালের বাজারে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে তৈরি হওয়া এই বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, কৃষকের কাছ থেকে ৫০ কেজি ধান কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা। এই ধান থেকে প্রায় ২৫ কেজি চাল উৎপাদন হয়। পাশাপাশি কুঁড়া, তুষ, খুদ ও ভাঙা চাল বিক্রি করেও আয় করেন মিল মালিকেরা। তারপরও মিলপর্যায়ে ৫০ কেজি চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে একই চালের দাম ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
তার ভাষায়, উৎপাদন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন খরচ যোগ করলেও এত বড় ব্যবধান যৌক্তিক নয়। বাজারের কোথাও না কোথাও অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে, যার পুরো বোঝা বহন করছে ভোক্তা।
এমআর/এআর




