মহিউদ্দিন রাব্বানি
১০ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম
- অর্থনীতির তুলনায় ২৫ ধাপ পিছিয়ে বিমা খাত
- বিমা খাতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন
- দাবি পরিশোধে বেইলআউট প্যাকেজ বিবেচনা
- দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ
- আস্থা ফেরাতে তিন স্তম্ভের সংস্কার পরিকল্পনা
- ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ডিজিটাল রূপান্তরে জোর
- কৃষি বিমা, মাইক্রোইনস্যুরেন্স ও তাকাফুলে গুরুত্ব
দেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হলেও সেই তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বিমা খাত। গ্রাহকের আস্থা সংকট, দীর্ঘদিনের সুশাসনের ঘাটতি, অনিষ্পন্ন দাবি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে সম্ভাবনাময় এ খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে ভিত্তি করে নতুন সংস্কার রোডম্যাপ করেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে বিমা শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বহু বছর ধরে বিভিন্ন বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে দাবি পরিশোধে বিলম্ব, আর্থিক অনিয়ম এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা খাতটির বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৭ হাজার কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তিতে অগ্রাধিকার
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এই বকেয়া দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রথমে আমরা সমস্যার উৎস চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি, এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে তাদের জমি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এসব সম্পদ ধাপে ধাপে নগদায়ন করে একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও সেগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে লিকুইডেট করে দ্রুত নিষ্পত্তির পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
>> আরও পড়ুন
প্রয়োজনে সরকারের কাছে বেইলআউট প্রস্তাব
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, গত তিন সপ্তাহে ছয় থেকে আটটি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো কোথায় এবং কীভাবে আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন আরও কার্যকর ও কঠোর করার কাজও সমান্তরালভাবে চলছে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের কাছে থাকা বিভিন্ন তথ্য আমাদের কাজকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। এজন্য আগামী সপ্তাহেই সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান বলেন, সব ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পরও যদি বড় অঙ্কের দায় অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সরকারের কাছে এককালীন বা ‘ওয়ান-টাইম’ বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এমন উদ্যোগের আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আর তৈরি হবে না। কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, সংকটের মূল কারণগুলোও দূর করতে হবে।
সংস্কারের তিন মূল স্তম্ভ
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাত সংস্কারে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
তার মতে, একটি শক্তিশালী বিমা শিল্প শুধু গ্রাহকদের সুরক্ষা দেয় না, বরং দেশের পুঁজিবাজার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিমা কোম্পানিগুলোর হাতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল থাকায় তারা অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।
সুশাসনের ঘাটতি ও আস্থার সংকট
অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের আর্থিক খাতের অন্যান্য অংশের মতো বিমা খাতেও দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহি ও সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিমা কোম্পানির মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে গ্রাহকের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সেবা প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ডিজিটাল রূপান্তর
আইডিআরএ জানিয়েছে, প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকি পদ্ধতির পরিবর্তে ধীরে ধীরে ‘রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন’ বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
এ ছাড়া খাতের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে অনেক বিমা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। ফলে গ্রাহকসেবা, তথ্য সংরক্ষণ, দাবি নিষ্পত্তি ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাইক্রোইনস্যুরেন্স, তাকাফুল ও নতুন সম্ভাবনা
মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণও আইডিআরএর অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে বিমার আওতায় আনতে সহজ ও সাশ্রয়ী বিমা পণ্য চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে ইসলামি বিমা বা তাকাফুল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিমা শিক্ষা চালু করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি বিমার প্রসার এখনও খুবই সীমিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষি বিমা সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। একইভাবে স্বাস্থ্যবিমার আওতাও এখনও সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে।
>> আরও পড়ুন
সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে বিমা খাতের গুরুত্ব অনেক হলেও বিমার প্রবেশযোগ্যতা এখনও কম। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা এ খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গতি বাড়াতে বীমা খাতকে একটি শক্ত ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে জনগণের আস্থা ফেরানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এ খাতে সুশাসন, কার্যকর নীতিমালা ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। বিমার প্রতি মানুষের বিশ্বাস তৈরি হলে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম হবে, তেমনই বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ বলেন, বিমা কমিশনকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অনিয়ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মোটরযান বিমার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নতুন খাতে বিমা সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
দাবি পরিশোধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম নুরুজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন থাকা বিমা দাবিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বিপুল দাবি আটকে থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএর আরও সক্রিয় ও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যেসব কোম্পানির পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা বিমা দাবি পরিশোধ করছে না, তাদের সম্পদ বিক্রির সুযোগ দিয়ে হলেও গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা উচিত। ভবন বা অন্যান্য সম্পদ রেখে গ্রাহকের অর্থ আটকে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
এস এম নুরুজ্জামান আরও বলেন, আর্থিক সংকটে থাকা বিমা কোম্পানিগুলোকে পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনে ব্যাংকের মতো ঋণ সুবিধা বা আইডিআরএর তত্ত্বাবধানে বিশেষ বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি যাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আস্থা ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো গ্রাহকের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বিমা খাত আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তাদের মতে, আইডিআরএর নতুন সংস্কার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে বিমা খাত নতুন আস্থা, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
এমআর/এএস