images

অর্থনীতি

রাত নামলেই জমে ওঠে নাজিরাবাজার, কাবাব-বিরিয়ানির সুবাসে মুখর পুরান ঢাকা

মাহফুজুর রহমান

১৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

পুরান ঢাকার খাবারের কথা উঠলেই যে কয়েকটি এলাকার নাম সবার আগে আসে, তার মধ্যে নাজিরাবাজার অন্যতম। দিনের বেলায় এটি একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা হলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা যেন রূপ নেয় এক বিশাল খাদ্যপল্লিতে। কাবাবের ধোঁয়া, মসলার ঘ্রাণ, বিরিয়ানির সুবাস আর মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে নাজিরাবাজারের অলিগলি। বহু খাদ্যরসিকের কাছে এটি শুধু একটি বাজার নয়, বরং পুরান ঢাকার খাদ্য ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নাজিরাবাজারকে অনেকেই ‘পুরান ঢাকার খাবারের রাজধানী’ বলেও উল্লেখ করেন।

সন্ধ্যার পর বদলে যায় চেহারা
বিকেল গড়াতেই কাজী আলাউদ্দিন রোড ও আশপাশের সড়কে একের পর এক খাবারের দোকান জমে ওঠে। অফিস শেষে কর্মজীবী মানুষ, পরিবার, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে আসা খাদ্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে।

নাজিরাবাজারের বিশেষত্ব হলো এখানে একই সঙ্গে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, কাবাব, নেহারি, কালাভুনা, রেশমি কাবাব, আফগানি কাবাব, বটি কাবাব এবং নানা ধরনের শরবত ও লাচ্ছি। পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এসব খাবার দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। 

e9f3018a-c7c5-4bca-aead-1ecf6b3f5eac

কাবাবের জন্য আলাদা খ্যাতি
নাজিরাবাজারের রাতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কাবাব। সন্ধ্যার পর রাস্তার দুই পাশে সারি সারি চুল্লিতে কয়লার আগুনে ঝলসানো হয় বিভিন্ন ধরনের কাবাব। রেশমি, হারিয়ালি, আফগানি, টিক্কা ও বটি কাবাবের সুবাস পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কাবাবের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় নান, পরোটা কিংবা লুচি।

খাদ্যরসিকদের মতে, পুরান ঢাকার অন্য অনেক এলাকার তুলনায় নাজিরাবাজারের কাবাবে মসলার ব্যবহার এবং প্রস্তুত প্রণালীর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বহু দোকানে এখনো পুরোনো রেসিপি অনুসরণ করা হয়, যা খাবারের স্বাদকে আলাদা মাত্রা দেয়।

বিরিয়ানিরও শক্ত অবস্থান
কাবাবের পাশাপাশি বিরিয়ানির জন্যও বিখ্যাত নাজিরাবাজার। এলাকার পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হানিফ বিরিয়ানি-নাজিরা বাজার, হাজি বিরিয়ানি, হাজি নান্না বিরিয়ানি-নাজিরা বাজার, মামুন বিরিয়ানি হাউজ-নাজিরা বাজার, মতি বিরিয়ানি হাউজ-নাজিরা বাজার এবং বোখারি বিরিয়ানি প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে খাবার খেতে কিংবা পার্সেল নিতে আসেন।

অনেকেই রাতের খাবারে কাচ্চি বিরিয়ানি কিংবা গরুর মাংসের বিরিয়ানি পছন্দ করেন। আবার কেউ কেউ কাবাবের সঙ্গে পরোটা কিংবা নান খেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। 

খাবারের সঙ্গে আড্ডার সংস্কৃতি
নাজিরাবাজার শুধু খাবারের জায়গা নয়; এটি আড্ডারও একটি কেন্দ্র। রাতে এখানে মানুষের উপস্থিতি কমে না। বন্ধুদের দল, পরিবার কিংবা বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা খাবারের টেবিলে গল্প-আড্ডায় মেতে থাকেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু মানুষ শুধু খাবারের স্বাদ নিতে নয়, পুরান ঢাকার রাতের পরিবেশ উপভোগ করতেও এখানে আসেন। সরু রাস্তা, পুরোনো ভবন আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে ব্যবসা
নাজিরাবাজারের অনেক খাবারের দোকান কয়েক দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছে। পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ব্যবসার দায়িত্ব গেছে। ফলে পুরোনো স্বাদ ধরে রাখার একটি চেষ্টা এখনো দেখা যায়।

খাবার ব্যবসায়ীরা জানান, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পদ্ধতিতে রান্না করেন। বিশেষ করে কাবাব ও বিরিয়ানির ক্ষেত্রে মসলা তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ভ্রমণ-খাদ্য বিষয়ক আলোচনায় নাজিরাবাজারকে পুরান ঢাকার অন্যতম অবশ্য-দর্শন খাদ্যগন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক খাদ্যরসিক বিশেষভাবে হারিয়ালি কাবাব, শিক কাবাব, লাচ্ছি, ফালুদা ও মাট্ঠার প্রশংসা করেছেন।

জনপ্রিয়তার কারণে নাজিরাবাজারে যানজট, পার্কিং সংকট এবং অতিরিক্ত ভিড় প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে ছুটির দিন ও উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবে এসব অসুবিধা সত্ত্বেও খাবারের টানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ছুটে আসেন। 

আরও পড়ুন: 

ঐতিহ্যের সাক্ষী পুরান ঢাকার 'কাপ্তান বাজার' 

শতাব্দীর ঐতিহ্যে স্বাদ, ইতিহাসে অনন্য চকবাজারের শাহী ইফতার 

আরমানিটোলার চার্চ ও হারিয়ে যাওয়া এক সম্প্রদায় 

ব্যবসায়ী মো. কামরুল হোসেন বলেন, ‘নাজিরাবাজারের খাবারের সুনাম আজকের নয়, বহু বছরের। আমার বাবা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন, এখন আমি পরিচালনা করছি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকে। শুধু ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নয়, দেশের বাইরে থেকেও অনেক মানুষ পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে আসেন। আমরা চেষ্টা করি পুরোনো রেসিপি ও স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখতে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।’ 

ক্রেতা মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মিরপুরে থাকি। কিন্তু মাসে অন্তত দুই-তিনবার বন্ধুদের নিয়ে নাজিরাবাজারে আসি। এখানকার কাবাব আর বিরিয়ানির স্বাদ অন্য জায়গার তুলনায় আলাদা। বিশেষ করে কয়লার আগুনে তৈরি কাবাবের ঘ্রাণ ও স্বাদ আমাকে বারবার টেনে আনে। ভিড় ও যানজট থাকলেও খাবারের জন্য সেই কষ্ট মেনে নেওয়া যায়।’  

cdfdaec8-1565-4e8a-ab97-67174c81f200

আরেক ক্রেতা নুসরাত জাহান বলেন, ‘পরিবার নিয়ে প্রথমবার নাজিরাবাজারে এসেছিলাম কয়েক বছর আগে। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই চলে আসি। এখানে শুধু খাবার নয়, পুরান ঢাকার পরিবেশটাও উপভোগ করি। রাতের আলো, মানুষের কোলাহল আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু নাজিরাবাজারের খাবার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়।’

ঐতিহ্যের স্বাদে বেঁচে আছে নাজিরাবাজার
আধুনিক ঢাকায় নতুন নতুন রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও নাজিরাবাজারের আবেদন কমেনি। বরং পুরান ঢাকার খাবার সংস্কৃতির অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী এলাকা হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাবাবের ধোঁয়া, বিরিয়ানির সুবাস, রাতজাগা মানুষের ভিড় এবং শতবর্ষী খাদ্য ঐতিহ্যের সমন্বয়ে নাজিরাবাজার আজও রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় রাতের খাবারের গন্তব্য।খাদ্যরসিকদের কাছে তাই নাজিরাবাজার শুধুই একটি বাজার নয়; এটি পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাদের এক অনন্য মিলনস্থল।

এম/ক.ম