পুরান ঢাকার আরমানিটোলার পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। চারপাশে রাসায়নিক পণ্যের দোকান, এরোমেটিক দ্রব্যের তীব্র গন্ধ, সরু গলি আর ঠাসাঠাসি করে গড়ে ওঠা বেমানান দালানকোঠার ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন ইউরোপীয় ধাঁচের ফটক।
ফটকের গায়ে বড় করে লেখা ‘Armenian Church, 1781’। এই তারিখটিই যেন মুহূর্তে পথচারীকে থমকে দেয়। ফরাসি বিপ্লবেরও আট বছর আগের এক সাল! দু’শ বছরেরও বেশি পুরনো একটি খ্রিস্টান গির্জা, তাও আবার পুরান ঢাকার মতো এক জনাকীর্ণ এলাকায় বিষয়টি বিস্ময় জাগায় বৈকি।
বিজ্ঞাপন
এই গির্জাটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি ঢাকার ইতিহাসের এক নীরব অথচ গভীর সাক্ষ্য। এটি সেই সময়ের স্মারক, যখন ঢাকা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, আর নানা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পদচারণায় মুখর।

আর্মেনীয়দের আগমন: ইতিহাসের পথ ধরে
আর্মেনিয়া একটি প্রাচীন দেশ, যা বর্তমানে ইরান ও তুরস্কের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে অবস্থিত। প্রাচীনকালে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ছিল আরও বড়। ষোড়শ শতকে পারস্যের সাফাভি শাসকেরা আর্মেনিয়া দখল করার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে আর্মেনীয়রা ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাণিজ্যই হয়ে ওঠে তাদের টিকে থাকার প্রধান মাধ্যম।
বিজ্ঞাপন
ঠিক কবে আর্মেনীয়রা বাংলায় এসেছিলেন, তার নির্দিষ্ট নথি নেই। তবে তেজগাঁওয়ের ফার্মগেটে অবস্থিত গির্জা প্রাঙ্গনে পাওয়া ১৭১৪ থেকে ১৭৯৫ সালের মধ্যে মৃত আর্মেনীয়দের কবর থেকে অনুমান করা যায়, মোগল আমলেই তারা বাংলায় আসতে শুরু করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে ভাগ্যান্বেষণ।
মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে আর্মেনীয়রা ভারতে ব্যবসা করা, বসতি স্থাপন এবং গির্জা নির্মাণের অনুমতি পায়। প্রথমদিকে তারা পাটনা, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় ব্যবসা গড়ে তোলে। পরে ১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করলে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, গ্রিক ও চীনার পাশাপাশি আর্মেনীয়রাও তখন ঢাকার বাণিজ্যিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্যবসা, প্রভাব ও আরমানিটোলার জন্ম
সংখ্যায় আর্মেনীয়রা খুব বেশি না হলেও অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে তারা ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। অষ্টাদশ শতকে লবণ ব্যবসা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু লবণ উৎপাদন ও সরবরাহের ঠিকাদারি দেওয়া হতো স্থানীয় ব্যবসায়ীদের, যার বড় অংশই ছিলেন আর্মেনীয়। এছাড়া কাপড়, পান ও পাটের ব্যবসায় তাদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিশেষ করে পাটের সম্ভাবনাকে পণ্য হিসেবে প্রথম গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরাই। এই ব্যবসা থেকেই তারা বিপুল সম্পদের মালিক হন।
ব্যবসার সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় আর্মেনীয়দের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিজেদের আবাসনের জন্য তারা বাড়িঘর নির্মাণ করেন, গড়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র আর্মেনীয় পাড়া। সেই পাড়াই পরবর্তীতে পরিচিত হয় আরমানিটোলা নামে। সে সময়ের বাড়িঘরগুলো ছিল আর্মেনীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত, যার কিছু নিদর্শন আজও মানুষের আগ্রাসী ‘উন্নয়ন’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছে।

চার্চ অব দ্য রিজারেকশন: নির্মাণ ও পৃষ্ঠপোষকতা
আর্মেনীয়দের প্রথম দিকে আরমানিটোলায় একটি ছোট চ্যাপেলে প্রার্থনা চলত। তবে সম্প্রদায়ের সংখ্যা ও সামর্থ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন দেখা দেয় একটি বড় গির্জার।
১৭৮১ সালে এক বিত্তবান আর্মেনীয় জমিদার নিকোলাস পোগজ, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘নিকি সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন, সেই ছোট চ্যাপেলের জায়গায় কয়েক বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করেন একটি বিশাল গির্জা। এর নামকরণ করা হয় ‘চার্চ অব দ্য রিজারেকশন’।
এই জমিটি দান করেছিলেন আগা মিনাস ক্যাটচিক। গির্জা নির্মাণে আরও যারা সহায়তা করেছিলেন বলে লোকশ্রুতি রয়েছে, তারা হলেন- মাইকেল সার্কিস, অকোটাভাটাসেতুর সিভর্গ, আগা এমনিয়াস ও মার্কার পোগজ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গির্জা নির্মাণের আগেই জায়গাটি ছিল একটি কবরস্থান। সে কারণেই আজও গির্জার বারান্দা ও প্রাঙ্গনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য কবর।

স্থাপত্য ও নান্দনিকতা
কারুকাজ করা ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে বাঁ-পাশে চোখে পড়ে সাদা রঙের গির্জা ভবনটি। গির্জাটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৭ ফুট। প্রবেশের জন্য রয়েছে চারটি দরজা, আর বাতাস ও আলো চলাচলের জন্য রয়েছে ২৭টি জানালা। তিন দিক ঘিরে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা, চারপাশে আর্চ ও কলামের সারি।
গির্জার শেষ প্রান্তে রয়েছে একটি ষড়ভূজ আকৃতির টাওয়ার। পুরো ভবনটি সাদা রঙে রাঙানো হলেও কলাম ও রেলিংয়ের ধারগুলোতে হলুদ রঙের সূক্ষ্ম নকশা চোখে পড়ে।
ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সারি সারি কাঠের বেঞ্চ এটি মূল প্রার্থনাকক্ষ। কক্ষের শেষ মাথায় উঁচু বেদী, যার ওপর রয়েছে যিশুখ্রিষ্টের চিত্র ও ধাতব ক্রস। প্রবেশমুখের বাঁ পাশে একটি পেঁচানো সিঁড়ি উঠে গেছে দ্বিতীয় তলায়। ধারণা করা হয়, এই গ্যালারি অংশটি নারী ও শিশুদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

কবরস্থান ও এপিটাফ: স্মৃতির ভাষা
গির্জা প্রাঙ্গনের সবচেয়ে গভীর আবেদন লুকিয়ে আছে এর কবরগুলোতে। প্রতিটি কবরের ওপর মার্বেল পাথরের এপিটাফ, যেখানে খোদাই করা রয়েছে মৃত ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যুর সাল এবং স্বজনদের লেখা আবেগঘন স্মৃতিচারণ।
একটি কবর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্যাটচিক আভেটিক থমাসের কবর। ১৮৭৭ সালে প্রয়াত এই ব্যক্তির কবরের ওপর একমাত্র দেখা যায় একটি ওবেলিস্ক। এপিটাফে লেখা—
``A fond wife’s tribute
To her deeply mourned
And best of husband.”
ওবেলিস্কের ওপর রয়েছে মার্বেল পাথরে তৈরি মাদার মেরীর একটি ভাস্কর্য, যার একটি হাত দুর্ঘটনায় ভেঙে গেছে। এই ভাস্কর্যটি থমাসের স্ত্রী কলকাতা থেকে আনিয়েছিলেন।
এপিটাফগুলোতে আর্মেনীয় ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ দেখা যায়। কোথাও আছে বাইবেলের উদ্ধৃতি, কোথাও কবিতার ছোঁয়া। ব্যবহৃত পাথর শ্বেতপাথর, বেলেপাথর ও কষ্টিপাথর সবই কেনা হয়েছিল কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে।
সময়ের ঘণ্টা ও নিস্তব্ধতা
গির্জার ষড়ভূজ টাওয়ারের ভেতরে একসময় ঝুলত একটি বিখ্যাত ঘণ্টা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঢাকাবাসীর কাছে এই ঘণ্টাই ছিল সময় জানার একমাত্র মাধ্যম। তবে ১৮৮০ সালের দিকে আর্মেনীয় সম্প্রদায় আর্থিক সংকটে পড়লে ঘণ্টাবাদককে অবসর দেওয়া হয়, বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত ঘণ্টাধ্বনি। সেই সময় ঢাকার একটি সংবাদপত্র এ নিয়ে আক্ষেপ করে প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল।
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে গির্জার ক্লক টাওয়ার ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে কিছু সংস্কার করা হলেও আগের জৌলুশ আর ফিরে আসেনি।
শেষ আর্মেনীয় ও নিঃশব্দ উত্তরাধিকার
চার্চ প্রাঙ্গনের ভেতরে একটি সূর্যঘড়ি, পাশে ‘১৯২৯’ চিহ্নিত একটি বাড়ি যেখানে এখন চার্চের এক কর্মী পরিবারসহ থাকেন। প্রাঙ্গনের শেষ মাথায় লাল ইটের একটি পুরনো বাড়িতে থাকতেন চার্চের ওয়ার্ডেন।
এই গির্জার সর্বশেষ ওয়ার্ডেন ছিলেন মাইকেল জোসেফ মার্টিন। ২০০৫ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি কানাডায় মেয়েদের কাছে চলে গেলে ঢাকায় আর কোনো আর্মেনীয় বাসিন্দা অবশিষ্ট থাকেনি।
ইতিহাসের নীরব প্রহরী
আজ আরমানিটোলার আর্মেনীয় গির্জা সবসময় বন্ধ থাকে। নেই প্রার্থনার গমগমে পরিবেশ, নেই ঘণ্টাধ্বনি। তবুও এটি দাঁড়িয়ে আছে নীরবে, দৃঢ়ভাবে। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি বাস্তবতার মাঝে এই গির্জা যেন ইতিহাসের এক স্থির ছবি, যা বলে যায় বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের গল্প।
এই গির্জা শুধু আর্মেনীয়দের নয় এটি ঢাকার, বাংলাদেশের, আর এই ভূখণ্ডে বহুকাল ধরে বসবাস করা নানা জাতি ও ধর্মের মানুষের যৌথ ইতিহাসের এক অমূল্য স্মারক।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মির্জা রকিব বলেন, ‘আরমানিটোলার আর্মেনীয় গির্জাটি ঢাকার ইতিহাস বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চরিত্রের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। আর্মেনীয়রা সংখ্যায় কম হলেও অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্যে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এই গির্জার কবরস্থান, এপিটাফ ও স্থাপত্য উপাদান আমাদের জানায় ঢাকায় বসবাসকারী বিদেশি সম্প্রদায়গুলোর জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কথা। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা হলে এটি ঢাকার নগর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’
স্থাপত্য বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী অভ্র রহমান বলেন, ‘আর্মেনীয় গির্জার স্থাপত্য ঢাকার প্রেক্ষাপটে একেবারেই ব্যতিক্রমী। ইউরোপীয় গির্জা স্থাপত্যের সঙ্গে স্থানীয় জলবায়ু ও উপকরণের একটি সূক্ষ্ম সমন্বয় এখানে দেখা যায়। লম্বা বারান্দা, বহু জানালা, আর্চ ও কলামের ব্যবহার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। ষড়ভূজ টাওয়ার এবং গ্যালারি অংশ পরিকল্পিত নকশার পরিচয় দেয়। আজ চারপাশের বেমানান উন্নয়নের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই গির্জা প্রমাণ করে, ভালো স্থাপত্য সময়ের স্রোতেও টিকে থাকতে পারে যদি তাকে রক্ষা করা হয়।’

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল আলম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই গির্জাটিকে দেখছি, কিন্তু ভেতরে ঢোকার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। আশপাশের রাস্তা বদলে গেছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু গির্জাটা যেন আগের মতোই আছে। এখানে এলে একটা অন্যরকম শান্তি লাগে। কবরগুলো দেখে মনে হয় কত মানুষের গল্প লুকিয়ে আছে এখানে। আমরা প্রতিদিন পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, কিন্তু অনেকেই জানি না এর ইতিহাস কী। আমার মনে হয়, এই গির্জার গল্পগুলো নতুন প্রজন্মকে জানানো দরকার, না হলে একদিন শুধু নামটাই থেকে যাবে।’
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রুকসানা পারভিন বলেন, ‘আরমানিটোলার আর্মেনীয় গির্জা সংরক্ষণের প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বা জাতিগত ঐতিহ্য নয়, বরং ঢাকার বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতীক। চারপাশের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন গির্জাটির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।’
তার পরামর্শ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যফলক স্থাপন এবং সীমিত পরিসরে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া গেলে এটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। এই গির্জা রক্ষা মানে ঢাকার স্মৃতিকে রক্ষা করা।
এম/এএইচ
