নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সরকার একটি ভিন্নধর্মী বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করেছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে দেশের অর্থনীতি কিছু গোষ্ঠী ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত মানুষের স্বার্থকেন্দ্রিক ছিল। এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকার প্রতিটি মানুষকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সে কারণেই সবার জন্য বাংলাদেশ স্লোগানকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি বাজেট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকা মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে দেশের অর্থনীতি মূলত পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ছিল। কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা সংগঠিত স্বার্থান্বেষী মহল অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও অনেক মানুষ উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রয়ে গিয়েছিল। এবারের বাজেটে সেই বৈষম্য কমিয়ে সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটে সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের জন্য কমবেশি বরাদ্দ, কর্মসূচি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রোডম্যাপও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণেই এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট, দর্শন ও পরিকল্পনা অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন।’
আরও পড়ুন: উচ্চাশার বাজেট, বাস্তবতার পরীক্ষা
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত দেড় দশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর ওপর পরিচালিত হলেও বর্তমানে অনেক দেশ সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ এখন বিশ্ব বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ছে।’
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকার অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সবার জন্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে কাজ করছে।’
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। এগুলো হলো ভ্যালু ফর মানি, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক বিবেচনা। এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখেই আগামী দিনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। সে কারণেই সরকার বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী জানান, বাজেটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় একটি নাগরিক বাজেট প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে একজন নাগরিক এক নজরে পুরো বাজেটের মূল বিষয়গুলো বুঝতে পারেন। এ বিষয়ে জনগণের কোনো প্রশ্ন থাকলে সরকার তার ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বাজেটের ওপর দীর্ঘ বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং বাজেট সম্পর্কে গণমাধ্যমের মতামত ও পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানান।
এএইচ/এমআই