মহিউদ্দিন রাব্বানি
২২ মে ২০২৬, ০২:৩১ পিএম
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর খুচরা বাজারে আবারও চড়া মসলার দাম। আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি থাকলেও খুচরা পর্যায়ে জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, আদা-রসুনসহ প্রায় সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, হাতিরপুলসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে মসলার পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও দাম আগের তুলনায় বেশি। বিক্রেতাদের ভাষ্য, ঈদকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই দাম বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা পর্যায়ে।
খুচরা বাজারে কোন মসলার দাম কত
বাজারে প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায়, এক মাস আগে যা ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। লবঙ্গ কেজিতে ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আগে ছিল ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ টাকা।
আরও পড়ুন: পেঁপের দামেও অস্বস্তি, ১৫ টাকার সবজি এখন ১০০!
সবচেয়ে বেশি দামের চাপ এলাচে। এক থেকে দেড় মাসে কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে এখন মানভেদে ৪,৪০০ থেকে ৫,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫৫০ টাকা, গোলমরিচ ১,২০০ থেকে ১,৩৫০ টাকা, তেজপাতা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, হলুদ ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ৩২০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া আদা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং রসুন ১০০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কিসমিসও কেজিতে প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ক্রেতাদের চাপ, বাজেটে টান
খুচরা বাজারে গিয়ে ক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগেই নিত্যপণ্যের চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রান্নার মসলাও নিয়ন্ত্রণ করে কিনতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার চৌধুরী বলেন, আগে যে টাকায় এক মাসের মসলা কিনতাম, এখন সেই টাকায় এক সপ্তাহও চলে না। ঈদ এলেই বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়।

যাত্রাবাড়ীর মসলা মার্কেটে মসলা কিনতে আসেন রাশেদা বেগম। তিনি বলেন, সব দোকানেই মসলা আছে, ঘাটতি নেই। তবুও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ। প্রতি বছরই এর সময় হু করে দাম বেড়ে যায়। ঈদে এমনিতেই কোরবানি ঈদে বাড়তি খরচ তারপর মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় চাপটা একটু বেশিই হয়।
আরেক ক্রেতা সাব্বির ইসলাম বলেন, চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে ঠিক আছে, কিন্তু এতটা বাড়া অস্বাভাবিক। সরকার নজরদারি বাড়ালে এই অবস্থা হতো না।
বিক্রেতাদের ব্যাখ্যা
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির পেছনে পাইকারি বাজারের চাপই মূল কারণ।
যাত্রাবাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী শাহজাহান বলেন, ঈদের সময় সবসময়ই চাহিদা বেড়ে যায়। মানুষ একসঙ্গে কিনে রাখে। আমরা বেশি দামে কিনি, তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব না।
আরও পড়ুন: সবজির বাজারে আগুন, স্বস্তি নেই মাছ-মাংসেও
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সাঈদ আহমেদ বলেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও পাইকারিতে দাম বাড়ছে। সেই কারণে খুচরায় প্রভাব পড়েছে।
তবে অনেক বিক্রেতা স্বীকার করছেন, চাহিদা বাড়ার সুযোগে কিছু পণ্যে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রবণতাও থাকে।
টিসিবি ও এনবিআরের তথ্য কী বলছে
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানায়, এক বছরের ব্যবধানে দারুচিনির দাম গড়ে ৫ শতাংশ, লবঙ্গ ৩ শতাংশ, এলাচ ৫ শতাংশ, আদা ১৩ শতাংশ এবং শুকনা মরিচ প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে জিরার দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৭৪ হাজার টন মসলা আমদানি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আরও প্রায় ২ লাখ টন মসলা আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে সরবরাহের ঘাটতি থাকার কথা নয়।
আমদানি স্বাভাবিক, তবু দাম কেন?
আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, ডলার সংকট, এলসি জটিলতা এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বাড়ছে। তবে বাজারে সরবরাহ যথেষ্ট থাকায় বড় ধরনের সংকট নেই।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী এনায়েত উল্লাহ বলেন, মসলার বাজার স্থিতিশীল। এই সময় যে দাম থাকা উচিত, তার তুলনায় অনেক পণ্যের দাম বরং কম আছে।
তিনি আরও বলেন, চোরাচালানের মাধ্যমে কিছু মসলা আসার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে থাকেন, কিন্তু বাজারে বড় কোনো সংকট নেই।
নজরদারির ঘাটতির অভিযোগ
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতি বছর ঈদের আগে মসলার বাজারে চাপ তৈরি হয়। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দেন। যথাযথ মনিটরিং থাকলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
আরও পড়ুন: ‘করের চাপে বিনিয়োগ থমকে গেছে, ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার লড়াই করছেন’
তার মতে, আমদানি থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত নজরদারি না থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক, আমদানিও যথেষ্ট, তারপরও ঈদকে কেন্দ্র করে খুচরা বাজারে মসলার দাম বাড়ায় তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। ফলে একদিকে ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা, অন্যদিকে ক্রেতাদের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে বাজারে চাপে সাধারণ ভোক্তারা।
এমআর/এআর