images

অর্থনীতি

সেবাখাতে আধিপত্য থাকলেও শিল্পখাতে পিছিয়ে দেশ

আব্দুল হাকিম

২১ মে ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম এখন অর্থনৈতিক ইউনিটের বড় অংশজুড়ে আধিপত্য করছে। তবে এই দ্রুত সম্প্রসারণের বিপরীতে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ধীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি বলছে, অর্থনীতির কাঠামোতে এই ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিবিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৪টি। এর মধ্যে ৯১ দশমিক ২৩ শতাংশই সেবা খাতভিত্তিক, আর উৎপাদন বা শিল্প খাতের অংশ মাত্র ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে-ব্যবসা-বাণিজ্য, খুচরা বিক্রি, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও উৎপাদনশীল শিল্প খাতের প্রসার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সেবা খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণে শিল্প খাতই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, শিল্প খাতের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

শুমারির তথ্যে দেখা যায়, মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ২১৪টি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৬২১টি অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান এবং ৫০ লাখ ১২ হাজার ৫২৯টি অর্থনৈতিক গৃহস্থালি রয়েছে। গৃহভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের এই বিস্তার দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির শক্তিশালী উপস্থিতিকে নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা গেলে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের মানোন্নয়ন সম্ভব।

শুমারির তথ্যমতে, মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ৭০ দশমিক ২৭ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত, আর শহরে রয়েছে ২৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় অংশ এখনো গ্রামকেন্দ্রিক। তবে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র, গৃহভিত্তিক ও সেবানির্ভর হওয়ায় শিল্পায়নের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অ-কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের চিত্রও একই ধরনের বাস্তবতা তুলে ধরে। দেশে বর্তমানে ৩ কোটি ৭ লাখ ৬১ হাজার ৩৪ জন মানুষ বিভিন্ন অ-কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ২ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ২৯৮ জন, নারী ৫১ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৭ জন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্য ২ হাজার ৫৯ জন। মোট কর্মসংস্থানের ৭৭ দশমিক ১০ শতাংশ স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে, ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে এবং ২০ দশমিক ৩২ শতাংশ গৃহভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত।

অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধির ধারাও উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৬ সালে দেশে যেখানে ইউনিট ছিল মাত্র ২১ লাখ ৬৯ হাজার ৪১৯টি, তা ২০০১-০৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৮ হাজার ১৪৪টি। ২০১৩ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি এবং ২০২৪ সালে এসে ১ কোটির বেশি অতিক্রম করেছে। যদিও এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক, তবুও খাতভিত্তিক ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

industry
গার্মেন্টস শিল্প দেশের প্রধান রফতানি খাত হলেও এর বাইরে শিল্প বৈচিত্র্য খুব বেশি বাড়েনি।

স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০০১-০৩ সালে যেখানে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান ছিল ২৯ লাখ ৯১ হাজার ২৩৮টি, তা ২০১৩ সালে বেড়ে হয় ৪৫ লাখ ১৪ হাজার ৯১টি এবং ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ২১৪টি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র বা মাঝারি পর্যায়ের, যা বড় শিল্পে রূপান্তরিত হতে পারছে না।

ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যার বিষয়টিও শুমারিতে গুরুত্ব পেয়েছে। দেখা গেছে, ৮৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট কোনো না কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা মূলধনের অভাব, যা মোট সমস্যার ৪৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। এছাড়া সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ সমস্যার জন্য দায়ী। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং জামানতের বাধ্যবাধকতা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গৃহভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০১-০৩ সালে যেখানে এই ধরনের ইউনিট ছিল মাত্র ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৫টি, তা ২০১৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫৭১টি এবং ২০২৪ সালে ৫০ লাখ ১২ হাজার ৫২৯টিতে পৌঁছেছে। এটি একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তারকেও নির্দেশ করে।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক ৩২ লাখ ৯ হাজার ৮৫০টি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৯৫১টি, রাজশাহী বিভাগে ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬০৪টি, খুলনায় ১৫ লাখ ১৮ হাজার ১৩৪টি, রংপুরে ১৩ লাখ ৬১ হাজার ৪২৩টি, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৬৩২টি, বরিশালে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৬টি এবং সিলেটে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৪টি রয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সেবা খাতের আধিপত্যের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগে সেবা খাতে ব্যবসা শুরু করা যায়। দ্বিতীয়ত, নগরায়ন ও প্রযুক্তির বিস্তার সেবা খাতকে দ্রুত প্রসারিত করেছে। তৃতীয়ত, শিল্প খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জমির অভাব, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত জটিলতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। 

তারা আরও বলেন, শিল্প খাত শক্তিশালী না হলে দেশের রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সীমিত হয়ে পড়বে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত দেশের প্রধান রফতানি খাত হলেও এর বাইরে শিল্প বৈচিত্র্য খুব বেশি বাড়েনি। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে কয়েকটি সুপারিশও দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, শিল্পাঞ্চল ও অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালুর কথাও বলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল পদ্ধতি। প্রথমবারের মতো ট্যাবলেটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে তথ্যের নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক পরিবেশ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, আগের শুমারিতেও ছোট বা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ছোট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখানো হয়েছিল, যদিও সে সময় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের আকার সংকুচিত হয়েছে, আর মাঝারি খাতে তেমন বড় কোনো বিস্তার হয়নি। এটি অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ইউনিটের হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও স্বাভাবিক। মানুষের শহরমুখী অভিবাসন বৃদ্ধির কারণে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অংশ কমে আসছে, যা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

এনামুল হক আরো বলেন, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে গৃহভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক মানুষ নিজের বাসাকে ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করে অনলাইন বা ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যার ফলে এই খাতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা গেছে। এটি সাম্প্রতিক সময়ের একটি বড় পরিবর্তন। অর্থনীতির কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন না হলেও ধীরে ধীরে সেবা খাতের গুরুত্ব বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেবা খাতের চাহিদা বাড়ে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। ভবিষ্যতে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে।

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এই শুমারির তথ্য দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বোঝার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে। বিশেষ করে শিল্প খাতের উন্নয়নে কোথায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতার বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রায় সঠিক, নির্ভুল এবং সময়োপযোগী তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। এই শুমারির মাধ্যমে আমরা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে একটি বাস্তবসম্মত ও বিস্তৃত ধারণা পেয়েছি। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক ইউনিটের গঠন, খাতভিত্তিক বণ্টন, কর্মসংস্থান, মালিকানা কাঠামো এবং উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রমের বৈচিত্র্য সবকিছুই আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়নে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. ফরহাদ সিদ্দিক বলেন, ‘দেশের টেকসই উন্নয়ন, কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার জন্য নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যান অপরিহার্য। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিবিএস নিয়মিতভাবে অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালনা করে আসছে, যার মাধ্যমে দেশের কৃষি বহির্ভূত সকল অর্থনৈতিক ইউনিটের কাঠামো, কার্যক্রম ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করা হয়।’

এএইচ/এমআর