- উৎপাদন সংকটে ঝুঁকিতে ৫৫০টির বেশি কারখানা
- ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের পর গভীর চাপে শিল্পখাত
- লক্ষাধিক শিক্ষিত-অশিক্ষিত নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে
- রিসাইকেল হাওয়াই চপ্পল শিল্প পরিবেশ দূষণ রোধে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
- ২০২৫ সালে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের পর ধাক্কায় টালমাটাল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
- ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের পর বিদেশি পাদুকার আমদানিও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে
- বাড়ছে বৈদেশিক রিজার্ভ মুদ্রার চাপ
ভ্যাট আরোপ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কারণে দেশের রিসাইকেলভিত্তিক প্লাস্টিক ও রাবারের পাদুকা শিল্প ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বাতিলের পর থেকেই একের পর এক ক্ষুদ্র কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার শেষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পাদুকা প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের আওতাভুক্ত ৫৫০টির বেশি কারখানা উৎপাদন ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। এসব কারখানার অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাইক্রো পর্যায়ের হওয়ায় উদ্যোক্তাদের পক্ষে বাড়তি ভ্যাট, সুদ ও কাঁচামালের খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে প্রতি জোড়া ১৫০ টাকা পর্যন্ত প্লাস্টিক ও রাবারের তৈরি হাওয়াই চপ্পল ও প্লাস্টিক পাদুকার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি হঠাৎ করেই সেই সুবিধা প্রত্যাহার করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটেও একই হার বহাল রাখা হয়।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে বিক্রি। আগে ১০০ টাকার একটি চপ্পল যেখানে সাধারণ মানুষ সহজেই কিনতে পারতেন, সেখানে এখন ভ্যাট যোগ হয়ে একই পণ্য ১১৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভিক্ষুকসহ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্য ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং দেশের বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এই খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক শিক্ষিত-অশিক্ষিত নারী-পুরুষ। কারখানার শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, ভাঙারি ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালা, দোকানদার, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে গ্রামীণ হাট-বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের মতে, শিল্পটি ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু কারখানা বন্ধ হবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও রাবার সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাও কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, এই রিসাইকেলভিত্তিক পাদুকা শিল্প পরিবেশ সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক, পুরোনো জুতা ও রাবার পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন পাদুকা তৈরি করা হয়। এর ফলে একদিকে পরিবেশ দূষণ কমে, অন্যদিকে অপচনশীল বর্জ্যের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত হয়।
সমিতির নেতাদের দাবি, রিসাইকেল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল প্লাস্টিক ও রাবারের বর্জ্য যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়বে। এতে পরিবেশ দূষণ বাড়বে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।
তথ্যমতে, ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারের পর বিদেশি পাদুকার আমদানিও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সমজাতীয় পণ্যের আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ২৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২২০ কোটি টাকায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও আমদানির পরিমাণ ১ হাজার ১৭১ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্পের ওপর ভ্যাট চাপিয়ে বিদেশি পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের গড়ে তোলা শিল্প ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্প গরিব মানুষের জন্য সাশ্রয়ী পাদুকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকার যদি পুনরায় ভ্যাট অব্যাহতি দেয়, তাহলে এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। মূলত রিসাইকেলভিত্তিক পণ্য উৎপাদন করলেও কিছু কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয়। ডলারের দাম ও ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়েছে, আবার ভ্যাটও যোগ হয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পাদুকা প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি হাজী ফজলু বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যের পাদুকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন রিকশাচালক, কৃষক বা দিনমজুরের কাছে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ টাকাও বড় বিষয়। ফলে এ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট আরোপ করলে তা নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
তিনি বলেন, এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কাঁচামাল সংগ্রহকারী জড়িত। ভ্যাট অব্যাহতি পুনর্বহাল না হলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাজী ফজলু বলেন, দেশীয় উৎপাদন নিরুৎসাহিত হলে বিদেশি পণ্য বাজার দখল করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। এই শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের বড় একটি অংশ আসে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও রাবার থেকে, যা পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও রিসাইকেলভিত্তিক শিল্পে হঠাৎ উচ্চহারে ভ্যাট আরোপ করলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বিশেষ করে যেসব শিল্প একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখে, সেসব খাতে করনীতিতে আরও বাস্তবসম্মত ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ আহসান হাবিব বলেন, প্লাস্টিক ও রাবার রিসাইকেলভিত্তিক পাদুকা শিল্প শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়, এটি বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ। এখানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ভ্যাট ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে বিদেশি পণ্যের আমদানি বাড়ে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে রিসাইক্লিং কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে পরিবেশ ব্যবস্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এমআর/এএস




