মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৮ এএম
- গত ফেব্রুয়ারিতেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩১৩ কোটি ডলার
- গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি মোট বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১,৬৯১ কোটি ডলার
- আট মাসে আমদানি ব্যয় ৪,৬১৭ কোটি ডলার
- বিপরীতে রফতানি আয় ২,৯২৬ কোটি ডলার
- আট মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৪০৮ কোটি ডলারে
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ বড় হচ্ছে। আমদানির ব্যয় বাড়লেও রফতানি আয় না বাড়ায় প্রতি মাসেই এই ঘাটতি বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র এক মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩১৩ কোটি ডলার। মূলত পণ্য রফতানি কমে যাওয়া এবং আমদানির উচ্চমূল্যের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: যুদ্ধের প্রভাব, দেশে দরিদ্র বাড়তে পারে ১২ লাখ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের (বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার। এর আগের মাস অর্থাৎ জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই ঘাটতি বেড়েছে ৩১৩ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে ৩২০ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭০ কোটি ৬ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। এর বিপরীতে দেশের পণ্য রফতানি আয় করেছে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ১ লাখ ডলার। ফলে এই সময়ে রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ ডলার বেশি হয়েছে, যা বড় আকারের এই ঘাটতি তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লেও বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতায় রফতানি আয়ে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরছে না।
আরও পড়ুন: ‘এলসিডি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না’
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি দেশের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতিও গত ফেব্রুয়ারি মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল মাত্র ৩১ কোটি ৯ লাখ ডলার। কিন্তু আট মাস শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে এক লাফে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে ৭০ কোটি ডলার। সাধারণত পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আসা আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করে চলতি হিসাবের ভারসাম্য নির্ধারণ করা হয়। এই ক্ষেত্রে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেনে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
তবে এই নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে আর্থিক হিসাব (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট)। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪০৮ কোটি ৩ লাখ ডলার। জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ১৯০ কোটি ৭ লাখ ডলার। এক মাসের ব্যবধানে আর্থিক হিসাবে বড় অঙ্কের এই উল্লম্ফনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত বিদেশি ঋণের নিট প্রবাহ বৃদ্ধি এবং ট্রেড ক্রেডিট বা পণ্য আমদানির বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের স্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলে আর্থিক হিসাবে এই বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের জিডিপি কমতে পারে ১.২ শতাংশ: সানেম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ট্রেড ক্রেডিটেও বড় উন্নতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে ২৫৬ কোটি ২ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যা জানুয়ারি শেষে ছিল ১০৩ কোটি ১ লাখ ডলার। ট্রেড ক্রেডিট হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে পণ্য বা সেবা এখনই গ্রহণ করা হলেও তার মূল্য পরিশোধ করা হয় পরে। এটি মূলত ব্যালান্স অব পেমেন্টের একটি স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ হিসেবে কাজ করে।
বাণিজ্য ও চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) বড় ধরনের উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যেখানে সার্বিক ভারসাম্যে ১২৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল, সেখানে আট মাস শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪২ কোটি ৭ লাখ ডলারে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, তবে আর্থিক হিসাবের এই উদ্বৃত্ত এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমে আসবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য রফতানি আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল জনজীবন
এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের দেশের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম কারণ অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট। বিশেষত আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ এই সঙ্কটকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম বা পদক্ষেপ লক্ষ্যণীয় হয়নি। কাজেই সামনের দিনগুলোতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। এজন্য সরকারকে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং বিপরীতে রফতানি আয়ের নতুন নতুন উৎস বের করতে হবে।
টিএই/এআর