মূল্যস্ফীতির ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। চালের দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও শাক-সবজি ও মাছের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট মার্চ ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির (৯.০১ শতাংশ) চেয়েও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর খাদ্য খাতই আবার মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জানুয়ারিতে যেখানে চালের অবদান ছিল ২২.১৬ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.২০ শতাংশে। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কারণ একই সময়ে শাক-সবজি ও মাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিতে তাদের অবদান দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে সবজির অবদান ৮.৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯.১৩ শতাংশে পৌঁছানো বাজারে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফেব্রুয়ারি মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিও এই চাপকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
রাজস্ব খাতেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ফেব্রুয়ারিতে ৪২,০৫১ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩০,৫৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ওপর। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে যাওয়ায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া, জ্বালানি খাতেও চাপ বাড়ছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫.১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তবুও জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, রাজস্ব খাতে সংস্কার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সূচকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে না পারলে সামাজিক বৈষম্য আরো তীব্র হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এএইচ/এফএ




