বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘এলসিডি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

DCCI

এলসিডি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে যে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা মোকাবিলায় এখনো দৃশ্যমান ও সমন্বিত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না— এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং নীতিগত দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে এলসিডি-পরবর্তী সময়ে দেশের শিল্পখাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে।


বিজ্ঞাপন


বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, ইউরোপের দেশগুলোতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন।

তিনি আরো বলেন, এলসিডি পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

তিনি বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানোর ওপর জোর দেন। একইসঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, জ্বালানি খরচ ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক চাপে পড়বে।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর এবং এর বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। আর তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে গেলে অতিরিক্ত ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ব্যয় বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।

ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে, সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং প্রতি কন্টেইনার পরিবহন খরচ ৫০০ থেকে ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এটিকে আরো তীব্র করেছে। গ্যাস সংকটের কারণে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আগামী জুন পর্যন্ত কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় ৬ লাখ মেট্রিক টন সারের বিপরীতে প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন, জ্বালানি খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে গ্যাস অনুসন্ধানে সক্ষমতা বাড়ানো এবং কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা জরুরি। এ ছাড়া বিদ্যুৎচালিত যানবাহন নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এফবিসিসিআই’র প্রশাসক আব্দুর রহিম খান বলেন, জ্বালানি সংকট এখন দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। এ সংকট মোকাবিলায় গ্রহণযোগ্য তথ্যভিত্তিক কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিদ্যমান শুল্কহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিইআরসি সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর বিকল্প নেই।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সৌর বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে বর্তমানে ২৭-৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে, যা এ খাতের বিকাশে বড় বাধা। তারা এ খাতে স্বল্পসুদে ঋণ, শুল্ক ছাড় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সৌর বিদ্যুৎখাতে ব্যবহৃত ব্যাটারি আমদানিতে অন্তত এক বছরের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও উঠে আসে।

ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সমন্বিত কমিটি গঠন করে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আবসার জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা ছিল এবং জ্বালানির দাম আরো বাড়লে এ ভর্তুকির চাপ বাড়বে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর অধিক গুরুত্বারোপের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বছরে কয়েকবার কমে থাকে। সে সময় অধিক পরিমাণে জ্বালানি ক্রয় ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে পারলে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তারা সতর্ক করে বলেন, এলসিডি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে না পারলে দেশের শিল্পখাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

টিএই/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর