আব্দুল হাকিম
০১ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেড় বছরের ব্যবধানে একনেকে অনুমোদিত সংশোধনের মাধ্যমে একের পর এক প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, যা নীতিগত ঘোষণার সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে।
একনেকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেড় বছরের মধ্যে ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে অতিরিক্ত যোগ হয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকের ১৯টি বৈঠকে মোট ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি প্রকল্পে ব্যয় কমানো হয়েছে, যেখানে সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। তবে বাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে। অর্থাৎ সংশোধনের প্রবণতা ব্যয় কমানোর চেয়ে বাড়ানোর দিকেই বেশি ছিল বলে নথি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশোধনের আগে এই ৬৫টি প্রকল্পের মোট প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। পরিবর্তনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ চার হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় অংকের বৃদ্ধি উন্নয়ন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রত্যাশা ছিল, আগের সরকারের আমলে বারবার প্রকল্প সংশোধনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তা রোধ করা হবে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে কঠোর যাচাই-বাছাই, প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ এবং সময়মতো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল। তবে বাস্তবে একনেকের বৈঠকগুলোতে একের পর এক প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়তে দেখা গেছে।
একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও ব্যয় বেড়েছে। গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। নারী ক্ষমতায়নে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক একটি কর্মসূচির বাজেটও সংশোধনের মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। পানি শোধনাগার, মহাসড়ক উন্নয়ন, বন্দর সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন নগর অবকাঠামো প্রকল্পেও অতিরিক্ত বরাদ্দ যুক্ত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে সংশোধন অস্বাভাবিক নয়। বাস্তবায়নের সময় প্রকৃত চাহিদা ও বাজারমূল্যের পরিবর্তনের কারণে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় সমন্বয় করতে হয়। তবে একাধিক প্রকল্পে ধারাবাহিকভাবে বড় অংকের ব্যয় বৃদ্ধি হলে তা পরিকল্পনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, শুরুতেই বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই না হলে পরে সংশোধনের চাপ বাড়ে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়ানো হলেও ব্যয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবও এই পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, কিছু প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্মাণসামগ্রীর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে। এছাড়া পূর্ববর্তী সময়ের কিছু প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের পর নতুন বাস্তবতায় বাজেট সংশোধন করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ ও সংখ্যার দিক থেকে বিষয়টি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
দেড় বছরের মধ্যে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলেও একনেক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। একই সময়ে কিছু জেলায় প্রকল্প ঘনত্ব বেশি হলেও অন্য কয়েকটি জেলায় তুলনামূলক কম প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন ব্যয় কেবল অর্থের পরিমাণ নয়, বরং এর কার্যকারিতা ও ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। যদি প্রকল্প সময়মতো শেষ না হয় বা প্রত্যাশিত সেবা না দেয়, তাহলে ব্যয় বৃদ্ধি উন্নয়নকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে। তাদের মতে, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন ছাড়া ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বর্তমান চিত্রের পার্থক্য নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ব্যবস্থাপনা কীভাবে আরও সুশৃঙ্খল করা যায়, সেটিই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প সংশোধনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে প্রাথমিক পর্যায়েই শক্তিশালী সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবসম্মত বাজেট নির্ধারণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি ঢাকা মেইলকে বলেন, অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে হলে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল এবং নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত পরিস্থিতি থেকে তা সচল করা ছিল বড় দায়িত্ব। মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অনেক। তবে মেয়াদ শেষে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সাফল্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার পুরোপুরি সফল হয়নি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুরবস্থা কাটেনি, প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে পড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ঘাটতি রয়ে গেছে।
মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অতি মূল্যায়নের অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, তারা সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাবে। কিন্তু চলমান প্রকল্পগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব স্পষ্ট নয়। সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে বড় অংকের ২৫টি প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টিও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন।
বতর্মান নির্বাচির সরকারকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, চলমান ও সদ্য অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। যেসব প্রকল্প এখনো শুরু হয়নি, সেগুলোর অগ্রাধিকার ও বাজেট যৌক্তিক কি না তা পুনরায় যাচাই করা উচিত। ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থ ফেরানো সম্ভব নয়, তবে ভবিষ্যতে অপচয় রোধে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এএইচ/জেবি