বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

অতি মূল্যায়িত মেগা প্রকল্পে শ্রীলঙ্কার মতো ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২০ এএম

শেয়ার করুন:

অতি মূল্যায়িত মেগা প্রকল্পে শ্রীলঙ্কার মতো ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!
অতি মূল্যায়িত মেগা প্রকল্পে শ্রীলঙ্কার মতো ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!
  • সুদেই যাচ্ছে রাজস্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ
  • প্রতি ৫ টাকার ১ টাকা ব্যয় শুধু সুদ পরিশোধে
  • ২৯টি বড় প্রকল্পে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি
  • বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার
  • ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৬৫-৭০ শতাংশে পৌঁছার শঙ্কা
  • প্রকল্পে ব্যয়ের ২৩-৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি

অতি মূল্যায়ন ও দুর্নীতিতে ফুলে-ফেঁপে উঠছে বড় প্রকল্পের ব্যয়। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। গবেষকরা বলছেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও অস্বচ্ছ চুক্তির কারণে বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বাড়ছে। উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে রাজস্বের বড় অংশ এখন সুদ ও ভর্তুকি মেটাতে চলে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নেওয়া বড় বড় প্রকল্পে অতি মূল্যায়ন, দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণঝুঁকির ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। এ ব্যাপারে এখনই সতর্ক না হলে শ্রীলঙ্কার মতো পরিণতি ভোগ করা লাগতে পারে বাংলাদেশকে।


বিজ্ঞাপন


গবেষকরা জানান, ঋণ নিলে সমস্যা নয়; সমস্যা হচ্ছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীনতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং জবাবদিহিতার অভাব, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।

সম্প্রতি ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ১৬ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। একই সময়ে সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের প্রতি পাঁচ টাকার মধ্যে এক টাকা শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকছে।

গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, বিমান চলাচল ও শিল্পাঞ্চলসহ ৪২টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা ও যোগসাজশের মাধ্যমে হারিয়ে গেছে।


বিজ্ঞাপন


গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পে দুই ধরনের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প সঠিকভাবে নির্মিত হলেও দাম অতিরিক্ত বেশি ধরা হয়। এতে আয় দিয়ে ব্যয় ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল পরিকল্পনা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে না। ফলে আয় কম হয়, কিন্তু ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হয়।

গবেষণার তথ্যে, বিদ্যুৎ খাতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে নির্দিষ্ট অংক পরিশোধ করতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যাতে খুচরা বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা যায়। ভর্তুকি বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।

২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের পরিশোধ ১১ গুণ এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বেড়েছে, অথচ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। অনেক কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অলস থাকলেও চুক্তির কারণে অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।

গবেষণায় ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় দিতে পারেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকশের সময় নেওয়া একাধিক প্রকল্প পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি গভীর সংকটে পড়ে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত ঋণ-জিডিপি অনুপাত সংশোধিত হিসাবে ৪২ শতাংশ, যেখানে আগে ৩৩ শতাংশকে নিরাপদ বলা হতো। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অনুপাত ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

তারা বলেন, কেবল স্বচ্ছতা নয়, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত তথ্য প্রকাশ, প্রকল্প শুরুর আগে জমি ও নকশা প্রস্তুতি যাচাই, কর্মসম্পাদনের সঙ্গে অর্থ পরিশোধ যুক্ত করা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ—এসব ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, চুক্তির দামে সামান্য বাড়তি নির্ধারণও দীর্ঘমেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। কয়েক সেন্ট বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনলেও ২০ থেকে ২৫ বছরে তা বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত দায়ে রূপ নেয়। তাঁর মতে, সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; বরং প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহিতাই বড় ঝুঁকি।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের জাকির হোসেন খান বলেন, জ্বালানি হলো অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু আমাদের বৈদেশিক ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার পরেও যদি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই আর্থিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছে।

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারে বলেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে প্রতিফলিত করে। ঝুঁকি হলো অর্থায়ন থেকে নীতিকে বিচ্ছিন্ন করা। ঋণ গ্রহণ যেন প্রকৃত, টেকসই উন্নয়নে রূপান্তরিত হয়, তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।

এফসিডিও’র গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু এলডিসি উত্তরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে, বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার একটি আর্থিক আবশ্যকতা। সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে আইএমএফ সুশাসন ডায়াগনস্টিকস এবং দাতাদের দক্ষতা ব্যবহার করে একটি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল, জ্বালানি-সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিপিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, বিশেষ আইন বাতিল এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রবর্তনের ফলে সৌরবিদ্যুতের শুল্ক ১০ সেন্ট থেকে কমিয়ে ৫-৮ সেন্টে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। জমির লভ্যতা এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে একটি টেকসই, সাশ্রয়ী জ্বালানি ভবিষ্যতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংগঠন বিএসআরইএর প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, যেখানে সৌরবিদ্যুতের দাম ৫ সেন্টের নিচে, সেখানে আমদানির পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় অব্যাহত রাখা উচিত নয়। গ্রিড-সংলগ্ন জমির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এখন আর কোনো বিকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য কৌশল।

বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্সের কো-চেয়ার কাওসার চৌধুরী বলেন, ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি এবং ৯,৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ে আমরা এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। খরচ ও দুর্নীতি কমাতে সরকারি জমিতে, যেমন খালের ওপর, প্রতিযোগিতামূলক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অপরিহার্য।

এএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর