রোববার, ১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ঋণনির্ভর প্রকল্পে ব্যর্থ টেকসই কর্মসংস্থান

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

S
ছবি- ঢাকা মেইল

# পরামর্শক ও কর্মশালাতেই কোটি কোটি টাকা ব্যয়
# পিকেএসএফের অর্থ সুদসহ ফেরত এসেছে
# প্রকল্পে এককালীন ১৩,৫০০ টাকার সহায়তা প্রদান
# জাইকার ১৮৮.৬৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ নাকচ ইআরডির

করোনার ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত প্রবাসী কর্মীদের সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকার বাস্তবায়ন করেছিল রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ) প্রকল্প। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল কোভিড-১৯ মহামারির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারদের পুনর্বাসন এবং টেকসই কর্মসংস্থান গড়ে তোলা।


বিজ্ঞাপন


প্রকল্পের আওতায় আড়াই লাখ পরিবারের মধ্যে এককালীন ১৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা বলছে, এই অর্থ সহায়তা দিয়ে স্থায়ী বা টেকসই কর্মসংস্থান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। 

দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা আফজাল হোসেন জানান, তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা পাওয়া টাকাগুলো শুধু সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই ব্যবহার করেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সেই অর্থ দিয়ে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, অল্প কিছু পুঁজি দিয়ে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করা গেলেও তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা কঠিন। টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হলে আরও বড় সহায়তা ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।


বিজ্ঞাপন


ইন্টারন্যাশনাল রিলিফ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ইআরডি) পরিচালিত অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০ জেলার উপকারভোগীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ সহায়তা স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান বা আয়ের কোনো স্থিতিশীলতা তৈরি হয়নি। 

পিকেএসএফের মাধ্যমে বিতরণকৃত অর্থ ফেরত এসেছে, যার ফলে সরকার কিছুটা আর্থিক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে বিতরণকৃত অর্থ ছিল অনুদান, যা ফেরতযোগ্য নয়। এই প্রেক্ষাপটে, বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে অনুদান বিতরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুধু রেইজ নয়, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য গত দুই দশকে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি)-এর তিনটি ধাপ, ইউএনডিপির ইউনিয়ন পরিষদ গভর্ন্যান্স প্রজেক্ট (ইউপিজিপি) এবং জাইকার অর্থায়নে উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ইউজিডিপি-১)-সব মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

প্রস্তাবিত ইউজিডিপি–২ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ১৮৮ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকার সমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নগর অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য সামনে রেখেই এই অর্থায়নের প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তবে আগের পর্যায়ের তুলনায় এবার ঋণের শর্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। ইউজিডিপি–১ বাস্তবায়নের সময় জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ০১ শতাংশ, যা প্রায় নামমাত্র সুদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সেই তুলনায় ইউজিডিপি–২-এ সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশে। অর্থাৎ আগের তুলনায় সুদের হার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের মতো খাতে তুলনামূলক বেশি সুদে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া অর্থনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এমন খাতে বিনিয়োগের সুফল সরাসরি আর্থিক মুনাফায় পরিমাপ করা যায় না, ফলে ঋণের ব্যয় যৌক্তিক কি না তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। প্রথম ধাপের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় এক দশক পরও যদি উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করতে আবার দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ নিতে হয়, তাহলে আগের প্রকল্প কতটা কার্যকর ছিল—সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।

ইআরডির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, পরামর্শকনির্ভর উন্নয়ন মডেল কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। বহু কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পরামর্শক নিয়োগ, কর্মশালা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহি বৃদ্ধি বা স্থানীয় সরকারের আর্থিক স্বনির্ভরতায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। নীতিমালার ঘাটতির কারণে দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পও বিদেশি ঋণে নেওয়া হচ্ছে। ফলে ঋণের সুদ ও পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগকে তাই এলজিএসপি, ইউপিজিপি ও ইউজিডিপি-১-এর সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইউজিডিপি-২ প্রকল্পের ঋণভিত্তিক বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাই করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। 

সম্প্রতি ইআরডির এক সভায় অতিরিক্ত সচিব ও আমেরিকা-জাপান উইং চিফ ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে সফল দেশগুলো গভর্ন্যান্স উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করেনি। ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সরকার বিভাগ কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সামাজিক সহায়তা বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের মতো খাতে সরাসরি আর্থিক রিটার্ন আসে না। মানবিক বিবেচনায় এ ধরনের ব্যয় করতে হলে ঋণ না নিয়ে রাজস্ব থেকে করা বেশি যুক্তিযুক্ত, বিশেষ করে যখন ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় দায় তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থ নয়, নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সরকার বিভাগ কখনোই স্বায়ত্তশাসিত ও দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ঋণনির্ভরতা হ্রাস ও স্থানীয় অর্থায়ন বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এএইচ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর