images

অর্থনীতি

ভোটের হাওয়ায় নগদ টাকার ছড়াছড়ি, চাঙা লেনদেন

মহিউদ্দিন রাব্বানি

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে চাঙা হচ্ছে অর্থনীতিও। প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের নানা খরচ মেটাতে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা হঠাৎ করে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। গ্রাম-গঞ্জের অর্থনীতিতে যেমন গতি এসেছে, তেমনি মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মাত্র দুই মাসে ব্যাংকিংব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। নভেম্বরে যেখানে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনি ব্যয় মেটাতেই এই অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে। প্রচারসামগ্রী ছাপানো, মাইকিং, পরিবহন, কর্মীদের দৈনিক খরচ ও জনসংযোগ কার্যক্রমে নগদ অর্থই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

আরও পড়ুন

ছাপাখানায় নেই চিরচেনা সেই ব্যস্ততা, শতকোটি টাকার বাণিজ্যে ধস

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিএফআইইউ নিয়মিত নজরদারি করছে এবং ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে এসব লেনদেনের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

উল্টো পথে নগদের গতি

এই উত্থান বিশেষভাবে নজর কাড়ছে, কারণ এর আগে কয়েক মাস ধরে নগদ অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ কমে আসছিল। নির্বাচন ঘিরেই সেই প্রবণতা হঠাৎ পাল্টে গেছে।

Taka
বেড়েছে নগদ টাকার লেনদেন। ছবি: সংগৃহীত

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশ নগদে হওয়ায় ভোটের আগে এমন পরিবর্তন নতুন কিছু নয়।

গ্রাম-গঞ্জে টাকার ছোঁয়া

নির্বাচনের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। উঠান বৈঠক, পথসভা, পোস্টার-ব্যানার, খাবার ও চা-নাশতার খরচ— সব মিলিয়ে গ্রামে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে।

আরও পড়ুন

সংকট পেরিয়ে আস্থার পথে ইসলামিক ব্যাংকিং

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়াও এই চিত্রের প্রমাণ। অনেক শ্রমিক শহর ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে নির্বাচনি প্রচারে যুক্ত হয়েছেন। ফলে মফস্বলের ছাপাখানা, পরিবহন খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো হঠাৎ করেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ী প্রার্থীর আধিক্য, বাড়তি ব্যয়

নির্বাচনি মাঠে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী ব্যবসায়ী বা শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেওয়ার সময় আর্থিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ায় ব্যয়ও বাড়ছে। ব্যবসায়ী-সমর্থিত প্রার্থীদের প্রচারণায় নগদ অর্থের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি হচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেই এই ব্যয়ের বিস্তার ঘটছে।

রেমিট্যান্সে জোয়ার, বাড়ছে তারল্য

নির্বাচনের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহেও দেখা যাচ্ছে বড় উল্লম্ফন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।

এই ডলার কিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে বিপুল অংকের টাকা ছাড়ছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ডলার কেনার বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। এতে টাকার বাজারে তারল্য বেড়েছে, যা নির্বাচনি ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নগদ প্রবাহ আরও বাড়িয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেনে কড়াকড়ি

ভোটের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে ডিজিটাল লেনদেনেও সীমা আরোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক লেনদেন সীমিত করা হয়েছে, বন্ধ রাখা হচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে অনলাইন অর্থ স্থানান্তর। উদ্দেশ্য একটাই— ভোটার প্রভাবিত করতে অর্থের অবৈধ ব্যবহার রোধ।

Vote2
দেশজুড়ে বিরাজ করছে নির্বাচনি উত্তাপ। ছবি: সংগৃহীত

চাঙা অর্থনীতি, তবে দামের চাপ বাড়ার শঙ্কা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের সময় সরকার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের ব্যয়ের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত টাকার প্রবাহ পৌঁছে যায়। এতে স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থান ও লেনদেন বাড়ে।

আরও পড়ুন

রাজধানীতে শেষ ঠিকানা, কোথায় কত খরচ

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ব্যয়ের বড় অংশই অনুৎপাদনশীল খাতে যায়। ফলে বাজারে চাহিদা বাড়ে, সরবরাহ না বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়। নির্বাচনের পর রমজান মাস আসায় এই চাপ আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, নির্বাচনি নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক হলেও কালোটাকার ব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি জরুরি।

নির্বাচনকে ঘিরে অর্থনীতিতে যে গতি এসেছে, তা একদিকে গ্রাম-গঞ্জে কর্মচাঞ্চল্য ও লেনদেন বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত নগদ অর্থ বাজারে ঢুকে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চাঙাভাব উৎপাদনমুখী খাতে রূপান্তর করা না গেলে নির্বাচন শেষে অর্থনীতি আবার স্থবির হয়ে পড়বে। উল্টো থেকে যাবে বাড়তি দাম ও আর্থিক চাপ— যা সামাল দেওয়া পরবর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এমআর/জেবি