শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ছাপাখানায় নেই চিরচেনা সেই ব্যস্ততা, শতকোটি টাকার বাণিজ্যে ধস

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

postar
প্রথমবারের মতো নির্বাচনে নেই পোস্টার। ছবি: সংগৃহীত
  • প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন নির্বাচন
  • ফকিরাপুল–বাংলাবাজারে নীরবতা, বন্ধ মেশিন
  • শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা, বিকল্প কাজের খোঁজ
  • আগাম কাগজ কিনে লোকসানের শঙ্কা
  • শতকোটি টাকার বাজারে বড় ধাক্কা
  • লিফলেট–হ্যান্ডবিলে সীমিত আয়

দেশে সাধারণত নির্বাচন এলেই ছাপাখানাগুলো হয়ে উঠে কর্মচঞ্চল। পোস্টার, লিফলেট আর ব্যানার ছাপাতে দিন-রাত চলে মেশিন। তবে এবারের নির্বাচনের দৃশ্যটা ভিন্ন। ছাপাখানায় নেই চিরচেনা সেই ব্যস্ততা। কারণ নির্বাচন কমিশন নতুন আচরণবিধিতে পোস্টার নিষিদ্ধ করেছে। এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে দেশজুড়ে ছাপাখানা শিল্পে নেমে এসেছে স্থবিরতা।


বিজ্ঞাপন


রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রেস মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে থাকলেও এবার কাজ নেই বললেই চলে। অতীতে ভোটের দুই-তিন মাস আগে থেকেই প্রচারসামগ্রী ছাপার অর্ডারে ব্যস্ত থাকত প্রেসগুলো। কিন্তু এবার পোস্টারবিহীন প্রচারের কারণে সেই চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে।

ভোট এলেও প্রেসে নেই উত্তাপ

ঢাকার ফকিরাপুল, পল্টন ও পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ছাপাখানায় কাজের চাপ আগে যেকোনো সময়ের তুলনা কম। কিছু মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকেরা গল্পে সময় কাটাচ্ছেন, কোথাও মালিকরা অনিশ্চয়তায় প্রেসে আসাই কমিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ পিভিসি ব্যানারেই চলছে নির্বাচনি প্রচার

পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের প্রেসের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, নির্বাচনের সময় পোস্টারই ছিল তাদের মূল আয়ের জায়গা। ওই আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়টা টিকিয়ে রাখা যেত। এবার নির্বাচন এলেও হাতে কাজ নেই। কর্মচারীদের নিয়মিত কাজ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

RR2
ছাপাখানায় নেই চিরচেনা ব্যস্ততা। ছবি: সংগৃহীত

শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম। নির্বাচনি মৌসুমে অতিরিক্ত কাজ করে বাড়তি আয় করা অনেক কর্মী এবার অলস সময় পার করছেন। কেউ কেউ বিকল্প কাজের সন্ধানে বের হয়েছেন।

আগাম বিনিয়োগ করে এখন বড় ঝুঁকির মুখে

নির্বাচনকে ঘিরে অনেক ছাপাখানা মালিক আগেভাগেই বিপুল পরিমাণ কাগজ কিনে রেখেছিলেন। এখন অর্ডার না থাকায় সেই কাগজ পড়ে আছে গুদামে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হলে কাগজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাবাজার প্রেসের ব্যবসায়ী আব্দুল মালিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কাজ আসবে ভেবে চড়া দামে কাগজ কিনেছি। এখন যদি পোস্টারের কাজ না আসে, তাহলে এই টাকা পুরোপুরি লোকসান হয়ে যাবে।’

শতকোটি টাকার বাজারে ধস

মুদ্রণ শিল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি মৌসুমে শুধু ঢাকাতেই পোস্টার ও প্রচারসামগ্রী ছাপিয়ে শতকোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় সেই বাজার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

ভোটে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশ দলেই নেই নারী প্রার্থী

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির এক সাবেক নেতা বলেন, শিট মেশিননির্ভর যেসব প্রেস পোস্টার ছাপার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু প্রেস নয়, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরাও আয় হারাচ্ছেন।

তবে কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি শূন্য নয়। পোস্টার না থাকলেও লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনের কিছু কাজ হচ্ছে। কিন্তু এতে আগের মতো লাভ আসছে না।

Vote2
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে ফকিরাপুলে প্রেস-প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাজুল ইসলাম। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, এই খাত অনেক দিন ধরেই মন্দার মধ্যে আছে। গত কয়েকটি নির্বাচনেই পোস্টার নিষিদ্ধ ছিল। এবারও একই অবস্থা। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় অর্ডার কমছে, ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে। আগে এক হাজার পোস্টারে যে লাভ হতো, এখন আট হাজার লিফলেট ছাপিয়েও সেই লাভ আসে না। ফলে বড় অঙ্কের কাজ হারাতে হচ্ছে।

অপরদিকে আরেক ব্যবসায়ী ইমাম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে। পরিবেশের কথা চিন্তা করে পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এটা আমরা বুঝি। আইনকে আমরা সম্মান করি। পোস্টার না থাকলেও ব্যানার ও ফেস্টুনের কিছু কাজ পাওয়া যাচ্ছে। হ্যান্ডবিলের চাহিদাও বেড়েছে। ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাইনি।

Vote
প্রথমবারের মতো পোস্টারের ছড়াছড়ি নেই। ছবি: সংগৃহীত

পোস্টারহীন নির্বাচনের ফলে শহরের দেয়াল, খুঁটি ও সড়ক অনেকটাই পরিচ্ছন্ন থাকছে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি স্বস্তির বিষয়। তবে এর অর্থনৈতিক চাপ পড়ছে নীরবে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ছাপাখানার ওপর।

বিকল্প ব্যবস্থা চান সংশ্লিষ্টরা

প্রেস মালিকদের মতে, প্রচারের ধরন বদলানো সময়ের দাবি। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাতটির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য বিকল্প সুযোগ তৈরি না হলে সংকট আরও গভীর হবে।

আরও পড়ুন

‘আদা-জল’ খেয়ে ভোটের মাঠে জামায়াতের নারী কর্মীরা!

তারা বলছেন, পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো জরুরি। তবে একই সঙ্গে ছাপাখানা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নতুন ধরনের সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। পোস্টারহীন এই নির্বাচন একদিকে এনে দিয়েছে পরিচ্ছন্ন নগরীর স্বস্তি, অন্যদিকে ছাপাখানা শিল্পের জন্য বয়ে এনেছে এক নীরব অর্থনৈতিক চাপ। ছাপাখানা শিল্পের জন্য তৈরি করেছে বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

এমআর/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর