Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

কারখানায় ছুটি, দোকানে তালা, থমকে গেছে গাজীপুরের অর্থনীতি

জেলা প্রতিনিধি

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

সকালে দোকানের ঝাঁপ খোলার কথা, কিন্তু ভাঙচুরের আতঙ্কে বন্ধ রাখতে হচ্ছে সেটিও। কারখানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও কাজ পাচ্ছেন না শ্রমিকেরা। মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করছে কম, কোথাও কোথাও আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ন্যূনতম মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা শ্রমিক আন্দোলনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গাজীপুরে। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বন্ধ থাকছে দোকানপাট ও বিপণিবিতান। ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহন মালিকেরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, থমকে গেছে গাজীপুরের অর্থনীতির চাকা।

শিল্প পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা সাত দিন ধরে ন্যূনতম মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন শ্রমিকেরা। শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও গত ১ নভেম্বর থেকে তা সহিংস রূপ নেয়। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তার কারণে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হচ্ছে।

গত ২ নভেম্বর সকাল থেকে কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় সাত ঘণ্টা যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়লে কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুরসহ আশপাশের দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

image

আন্দোলন চলাকালে নাওজোড় এলাকায় একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় বেশ কিছু যানবাহন। এর আগের দিন কোনাবাড়ী এলাকায় দুটি পুলিশ বক্স ও একটি কারখানার ঝুটের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। ভাঙচুর করা হয় ১৫টি যানবাহন। সেদিন শতাধিক শিল্পকারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। গত মঙ্গলবার সড়ক অবরোধের সময়ও বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।

বুধবার সকালেও আন্দোলনের প্রভাব পড়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকেরা। এ সময় বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করেন। এ ছাড়া নলজানি এলাকায় আন্দোলনের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে অন্য আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ।

দোকান বন্ধ, আয় নেই ব্যবসায়ীদের

শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আন্দোলনপ্রবণ এলাকার ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ভাষ্য, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলায় নিরাপত্তাহীনতা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় দোকানপাট খুলতে পারছেন না তাঁরা। সন্ধ্যার পর দোকান খুললেও ক্রেতার উপস্থিতি থাকে কম। ফলে প্রতিদিনই ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

মৌচাক এলাকার মুদি দোকানি রাব্বি বলেন, প্রতিদিনই শ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন। তাঁদের হামলার ভয়ে দোকান বন্ধ রাখতে হয়। এ ছাড়া পুলিশও টিয়ারশেল ছোড়ে। ছোট দোকানটির আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলে। এখন দোকান বন্ধ থাকায় কোনো আয় নেই। বাসাভাড়া ও সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

কারখানা বন্ধ, কাজহীন শ্রমিকেরা

আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনেও। কারখানা বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিককে কাজ ছাড়া বাড়িতে বসে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে যাঁদের আয়, তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেশি।

নাওজোড় এলাকার শ্যানন সোয়েটার কারখানার শ্রমিক সালমা বেগম বলেন, তিনি ওই কারখানায় চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন। যত উৎপাদন হয়, সেই অনুযায়ী তাঁর বেতন নির্ধারিত হয়। কিন্তু টানা শ্রমিক আন্দোলনের কারণে মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধ রেখেছে। কাজ না থাকায় এখন তাঁকে বাড়িতে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে।

ষষ্ঠ দিনেও থামেনি শ্রমিক আন্দোলন, গাজীপুরে ৫০ কারখানা বন্ধ

সালমা বেগম আরও বলেন, এভাবে ভাঙচুর ও বিভিন্ন স্থানে আগুন দেওয়ার ঘটনা চলতে থাকলে মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে দেবেন। তখন শ্রমিকেরা কোথায় কাজ করবেন, কী খাবেন? তাঁদের আবার গ্রামে ফিরে যেতে হবে।

যানবাহন ভাঙচুর, ক্ষতির মুখে পরিবহন মালিকেরা

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সহিংসতায় মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন স্থানে আটকে থেকেছে পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহন। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন পরিবহন মালিকেরা। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।

গাজীপুর জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তানভীর সিরাজ বলেন, সহিংস শ্রমিক বিক্ষোভে বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। বিভিন্ন রুটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে ছিল। এতে নিয়মিত গাড়িগুলো ট্রিপ দিতে পারেনি। সব মিলিয়ে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা না হওয়ায় ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে বসলে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে।

৪০ কারখানায় ছুটি, সাতজন আটক

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, বুধবার বিভিন্ন কারণে গাজীপুরে ৪০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা বিক্ষিপ্তভাবে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, গতকাল ভোগড়া বাইপাস এলাকায় টোল প্লাজা ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় ১ হাজার ২০০ অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে বাসন থানায় মামলা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখ (২১) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা রোধে পুলিশ, আনসার ও এসআরবি সদস্যদের পাশাপাশি ১৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিনিধি/এআর