মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক আন্দোলন, ৬ দিনে ৮৫০ কোটি টাকার লোকসান

আবুল হাসান, গাজীপুর
প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক আন্দোলন, ৬ দিনে ৮৫০ কোটি টাকার লোকসান
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক আন্দোলন। ছবি: ঢাকা মেইল

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের দাবিতে টানা ছয় দিন শ্রমিক বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয় গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে। এতে উৎপাদনমুখী কারখানা বন্ধ থাকায় লোকসান হয়েছে অন্তত ৮৫০ কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, মজুরি বোর্ড গঠন ও গেজেট প্রকাশের পরও শ্রমিকরা সহিংস আন্দোলন করেছেন। তাই বাধ্য হয়েই তারা কারখানা বন্ধ রেখেছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশি ক্রয়াদেশ হুমকির মুখে পড়েছে।

শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের দাবিকে কেন্দ্র করে কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্ত সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ার সেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে দুপুরের আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে নাওজোর ও ভোগরা বাইপাস এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদেরও সড়কে অবস্থান করতে দেখা গেছে । সংঘর্ষে  বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন সাতজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর শিল্পাঞ্চল -২ এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে কিছু সময় যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও সকাল পৌনে ১০টার পর নাওজোর এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তারা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এর আগে সোমবারও নাওজোর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই দিন একাধিক পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে । আহত হয়েছেন পুলিশ, সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন। এছাড়া গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী ও মৌচাক এলাকার বিভিন্নস্থানে শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। এসময় পুলিশ তাদের টিয়ার সেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

02

তিনি আরও বলেন, কিছু এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে। আজ এখন পর্যন্ত ৫৫টি কারখানা ছুটি দেওয়া হয়েছে। নাওজোর এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গত রোববার শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। সোমবার ছুটি ঘোষণা করা হয় ১৫০টি শিল্প কারখানা। এছাড়া মঙ্গলবার ৫৫টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

শিল্প মালিকদের দাবি, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে চাইছে। এদের ইন্ধনে কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়েছে।  তাদের অপতৎপরতার কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়ে লোকসান মেনে নিয়ে কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে মৌচাক এলাকার সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের মুখে আমাদের কারখানা ছয় দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ। এ অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে আমাদের এক কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াও সময়মতো পণ্য  শিপম্যান্টে সমস্যা হবে।

বিজিএমইএ-এর সদস্য ও শিল্প উদ্যোক্তা সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় মালিকদের আর্থিক লোকসানে পড়তে হচ্ছে। বিজিএমইএ-এর এক হিসাবে গত ছয় দিন শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ৮৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া হামলা, ভাঙচুরের ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিরুপন করা হয়নি।

আন্দোলনের মাঠ বিএনপি নেতাকর্মীরা
শ্রমিক আন্দোলনের ছদ্মবেশে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তাদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গত দুই দিন ধরে তারা বিভিন্ন স্থানে পুলিশের পাশাপাশি অবস্থান নিতে দেখা গেছে। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কোনাবাড়ি এলাকায় অবস্থান নেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার। কালিয়াকৈরে অবস্থান নেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান। এসময় তারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা রোধে নিজেদের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি যে কোন মূল্যে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হলে সমুচিত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

03

এদিকে, সরকার শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলেই দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এরপরও যারা আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা প্রকৃত শ্রমিক নয় বলে মন্তব্য করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান। 

মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিদর্শনে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, এখন যারা আন্দোলন করছে, তারা আর দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেই। গ্রেফতারদের মধ্যেও প্রকৃত শ্রমিক নেই। আজকের মিছিল থেকে ছাত্রলীগের পদধারী একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, যারা কাজ করতে চান, তাদের নিরাপত্তা দেবে পুলিশ। শুধু কর্মস্থল নয়, শ্রমিকদের বাসা ও চলাচলের পথেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তবে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এ আন্দোলন দেশকে অস্থিতিশীল করা ও শ্রম খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যারা ইন্ধন বা অর্থায়ন করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর