জেলা প্রতিনিধি
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় দুই রোহিঙ্গার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির ঘটনায় দায় কার, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী দুই ব্যক্তিকেও আসামি করে মামলা করেছেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান।
মামলায় আসামি করা হয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ নির্বাচন অফিসের কর্মচারী ও সাবেক তিন আউটসোর্সিং কর্মীকেও। তবে মামলা করার কয়েক দিন পরই চেয়ারম্যানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে সম্পৃক্ততা না পাওয়ার কথা জানিয়ে তাদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছেন মামলার বাদী। এ ঘটনায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, এনআইডি তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরি হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা এড়াতে পারেন না।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভোটার হতে জন্মনিবন্ধন, বাবা-মায়ের এনআইডি, নাগরিক সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাই ও স্ক্যান করার পর কম্পিউটার অপারেটর নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে তথ্য সার্ভারে প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ করেন। পরে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে এনআইডি আবেদনের হার্ডকপি থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর হার্ডকপি তিনি দেখাতে পারেননি।
গত ৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে কলমাকান্দা থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান।
মামলার আসামিরা হলেন- উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল (৬৪), নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়া (২৫), চাকরিচ্যুত ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কাঞ্চন মিয়া (২৯), আরিফ মিয়া (৩৪), স্ক্যানিং অপারেটর স্মরণ সরকার হীরা (৩০) এবং শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী (৪৯) ও মোকসেদ আলী (৪৪)।
মামলার পর ওই রাতেই মঞ্জুরুল মিয়া ও কাঞ্চন মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তিন দিন আগে তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
কলমাকান্দা থানার ওসি সোহেল রানা আজ মঙ্গলবার বলেন, এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া দুই আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
যাদের বাবা দেখিয়ে তৈরি রোহিঙ্গাদের এনআইডি
অভিযোগ অনুযায়ী, রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলীকে বাবা দেখিয়ে তার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন কাগজপত্র ব্যবহার করে নূর হালিমা নামে এক রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরি করা হয়েছে। একই গ্রামের মোকসেদ আলীকে বাবা দেখিয়ে তার এনআইডি ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করে মুজিবুর রহমান নামে আরেক রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরি করা হয়।
গত ১১ আগস্ট নূর হালিমার এনআইডি হস্তান্তর করা হয়েছে। আর মুজিবুর রহমানের এনআইডি এখনো সার্ভারে রয়েছে, হস্তান্তর করা হয়নি।
গত ৮ অক্টোবর এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে পরদিনই ভুক্তভোগী ওমর আলী ও মোকসেদ আলীকে মামলার আসামি করেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। তাদের সঙ্গে চেয়ারম্যানসহ নির্বাচন অফিসের আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রতিবাদ জানান চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরি করেছে নির্বাচন অফিস। অথচ নিজের দায় আড়াল করতে তদন্ত ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তা। যে দুই রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরি হয়েছে, তাদের জন্মনিবন্ধনের কোনো তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের সার্ভারে নেই। জন্মনিবন্ধনগুলো জাল করা হয়েছে। সনদে থাকা স্বাক্ষরও তার নয় বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান। এ ঘটনায় নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মামলার আসামি ওমর আলী বলেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ব্যবহার করে রোহিঙ্গার এনআইডি তৈরি করা হয়েছে। অথচ তাকেই মামলার আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই ভুক্তভোগী। আমার কাগজপত্র ব্যবহার করে নির্বাচন অফিস এমন কাজ করেছে। এই ঘটনায় আমার মামলা করার কথা নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, অথচ উল্টো আমার বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। আমি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হোক।’
ওমর আলীর ছেলে শামীম মিয়া বলেন, ছয়-সাত মাস আগে তার ছোট ভাই কাউছারের এনআইডি করার জন্য বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্বাচন অফিসে জমা দিয়েছিলেন। ওই কাগজপত্র ব্যবহার করেই রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরি করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। শামীম বলেন, ‘আসামি তো নির্বাচন কর্মকর্তার হওয়ার কথা, উল্টো আমার বাবা কেন আসামি হলেন?’
তিনজনের নাম বাদ দিতে আবেদন
মামলা করার পর গত সপ্তাহে চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল, ওমর আলী ও মোকসেদ আলীর নাম অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য এফিডেভিটসহ কাগজপত্র থানায় জমা দেন মামলার বাদী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান।
এ বিষয়ে ওসি সোহেল রানা বলেন, তিনজনকে মামলার অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বাদী এফিডেভিট করে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। তবে এভাবে মামলা থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়ার নিয়ম নেই। মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনজনকে প্রথমে আসামি করে পরে তাদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করার কারণ জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাহলে আগে কেন তাদের আসামি করা হয়েছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও বিষয়টি তদন্ত করছে।
নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে কমিশনের তদন্তের কথা বলেন।
দায় এড়ানোর সুযোগ নেই: জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন। তিনি বলেন, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও মামলা করার আগে তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। তদন্ত ছাড়া এভাবে নাম উল্লেখ করে মামলা করা উচিত হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করলে পুলিশের তদন্তে প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের নাম বেরিয়ে আসত।
মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন আরও বলেন, ‘এনআইডি তৈরির দায়িত্ব নির্বাচন কর্মকর্তার। এ জন্য অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়। রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরি হলে সেই দায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তার ওপরই বর্তায়। কাজটি যেই করুক, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা দায় এড়াতে পারেন না।’
তিনজনের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, মামলা হওয়ার পর এফিডেভিট করে আসামির নাম বাদ দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করবে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের তদন্ত চলছে। জড়িত কেউ ছাড় পাবেন না।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, এর আগেও কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির ঘটনায় তিনজন আউটসোর্সিং কর্মচারীর চাকরি চলে গিয়েছিল। সে সময়ের উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছিল। আগের ঘটনাটিও কমিশনের বর্তমান তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন জানান, নির্বাচন কমিশনের সহকারী ভোটার তালিকা নিবন্ধন কর্মকর্তা (এইআরও) আব্দুল লতিফ শেখ সম্প্রতি কলমাকান্দা গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে গেছেন।
উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত তিনজনকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। ওই ঘটনায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছিল।
প্রতিনিধি/এসআই